বাইক্কা বিল (Baikka Beel), বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় হাইল হাওরের পূর্বদিকে অবস্থিত। শ্রীমঙ্গল মানেই চা বাগান, লাউয়াছড়া, সাত রঙের চা এটুকুই বেশিরভাগ মানুষের মাথায় থাকে। কিন্তু শ্রীমঙ্গল থেকে মাত্র পনেরো কিলোমিটার দূরে হাইল হাওরের বুকে একটা বিল আছে যেটার কথা অনেকেই জানেন না। শীতকালে এখানে গেলে মনে হবে পাখির একটা আলাদা দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছেন! এখানে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি, বিলের জলে লাল শাপলার ছড়াছড়ি, আর দূরে দূরে পানির উপর ভাসমান সবুজ জলজ গাছপালা। ক্যামেরা আনুন বা না আনুন, এই দৃশ্য মনে গেঁথে যাবেই।
আরও: শ্রীমঙ্গল
বাইক্কা বিল কোথায়
বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় হাইল হাওরের পূর্বদিকে বাইক্কা বিলের অবস্থান। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার আর মৌলভীবাজার শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। ২০০৩ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় এই বিলটিকে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত হাইল হাওরের চাপরা-মাগুরা ও যাদুরিয়া বিল এবং পার্শ্ববর্তী জলাভূমি মিলিয়ে বাইক্কা বিল গঠিত এবং এর আয়তন প্রায় ১০০ হেক্টর, তবে বর্ষায় এটি অনেক বেশি বিস্তৃত হয়।
কী কী দেখবেন
পরিযায়ী পাখির মেলা: দর্শনার্থীদের কাছে বাইক্কা বিলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে শীতকালীন অতিথি পাখি। এখানে হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়ে এই বিলে আসে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি। পানকৌড়ি, বক, মাছরাঙা ছাড়াও শীতে ভিড় করে দেশি-বিদেশি অনেক পাখি। পাখি দেখতে ভোরবেলা আসতে পারেন। তবে, কুয়াশার বিষয়টা মাথায় রাখবেন। বেশি কুয়াশা হলে ভালো করে কিছুই দেখতে পাবেন না।
ওয়াচটাওয়ার: বিলের ভেতরে পাখি ও মাছ ভালোভাবে দেখার জন্য একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে। উপরে উঠলে পুরো বিলটাকে একসাথে দেখা যায়। চারদিকে জলের বিস্তার, মাঝে মাঝে পাখির ঝাঁক। ভোরের আলোয় এই দৃশ্যটা অসাধারণ লাগে।
লাল শাপলা আর পদ্মফুল: বিলের কিনার জুড়ে হাজারো শাপলা ফোটে থাকে এখানে। লাল শাপলার বিস্তার দেখে মনে হবে পানি আর ফুল যেন মিলেমিশে রয়েছে। ফড়িংয়ের উড়াউড়িও চলে সারাক্ষণ।
নৌকা ভ্রমণ: বিলের ভেতর দিয়ে নৌকায় ঘুরে দেখার ব্যবস্থা আছে। স্থানীয় মাঝিদের সাথে কথা বলে নৌকা ভাড়া করা যায়। নৌকায় বসে পাখি দেখা, মাছের লাফালাফি দেখা, এই অভিজ্ঞতাটাই বাইক্কা বিলের মূল আনন্দ।
মাছের বৈচিত্র্য: অভয়াশ্রম হওয়ায় এখানে প্রায় ৯০ প্রজাতির মাছ নিরাপদে বংশবৃদ্ধি করে। আইড়, কই, মেনি, ফলি, পাবদাসহ আরও অনেক প্রজাতি মাছ রয়েছে এখানে। পানির নিচে দল বেঁধে চলা মাছ সরাসরি দেখা যায় স্বচ্ছ পানিতে।
ভ্রমণের সেরা সময়
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার এই দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের সেরা সময় হচ্ছে, অক্টোবর থেকে মার্চ। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এই সময়টায় পরিযায়ী পাখির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে। শীতের সকালের কুয়াশাচ্ছন্ন আলোয় পাখির ডাক শুনতে শুনতে বিলের পাশে বসে থাকাটা বেশ অন্যরকম অনুভূতি। বর্ষায় বিল ফুলে ওঠে, জলের বিস্তার বাড়ে, তবে যাওয়া-আসা কঠিন হয়। শুকনো মৌসুমে বিল কিছুটা ছোট হয়ে আসে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল ট্রেনে (সবচেয়ে ভালো পথ): ঢাকার কমলাপুর থেকে শ্রীমঙ্গল সরাসরি বেশ কয়েকটি ট্রেন ছেড়ে যায়। পারাবত এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে (মঙ্গলবার বন্ধ), জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস দুপুর ২টায়, আর উপবন এক্সপ্রেস রাত ১০টায় (বুধবার বন্ধ)। ট্রেনে ভাড়া শ্রেণি ভেদে ১১৫ থেকে ৭৬৫ টাকার মতো।
বাসে: ঢাকার ফকিরাপুল বা সায়দাবাদ থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী, এনা পরিবহন, সিলেট এক্সপ্রেস এগুলো শ্রীমঙ্গল যায়। ভাড়া ৪০০ টাকা থেকে ১৮০০ টাকার মতো।
শ্রীমঙ্গল থেকে বাইক্কা বিল: শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সিএনজি, অটোরিকশা বা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে সরাসরি বাইক্কা বিল যাওয়া যায়। এখানের রাস্তা ভালো, সময় লাগে আধা ঘণ্টার মতো। শ্রীমঙ্গলে এসে স্থানীয় সিএনজিওয়ালাকে বললেই নিয়ে যাবে। হাজীপুর বাজার পর্যন্ত যান, সেখান থেকে বিল কাছেই।
কোথায় খাবেন
বাইক্কা বিলের কাছে বড় কোনো রেস্তোরাঁ বা হোটেল নেই। তাই শ্রীমঙ্গল থেকে বের হওয়ার আগে খেয়ে নেওয়া ভালো, অথবা শুকনো খাবার সাথে নিয়ে আসতে পারেন। শ্রীমঙ্গল শহরে ভালো খাবারের জন্য গ্র্যান্ড তাজ, হাবিব হোটেল, কুটুম বাড়ি আর শ্রীমঙ্গল ইন জনপ্রিয়।
কোথায় থাকবেন
আপনি শ্রীমঙ্গলেই থাকার জন্য হোটেল পাবেন। আর বাইক্কা বিল এখান থেকেই দিনে গিয়ে ফিরে আসা যায়। শ্রীমঙ্গলে বাজেট থেকে শুরু করে মানসম্পন্ন অনেক হোটেল ও রিসোর্ট আছে। হোটেল মেরিনা, প্যারাডাইস লজ, হোটেল মহসিন প্লাজা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া যায়। একটু বেশি খরচ করতে চাইলে নভেম ইকো রিসোর্ট, নিসর্গ ইকো কটেজ, শ্রীমঙ্গল টি রিসোর্ট, গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট বা শান্তি বাড়ি ভালো অপশন।
সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি
- বিলে মাছ ধরা যাবেনা।
- উচ্চ স্বরে বা জোরে শব্দ করা যাবেনা।
- বাগানের ভিতরে ও বিলের মধ্যে কোন বর্জ্য বা ময়লা ফেলা যাবেনা।
- পাখি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীকে উত্ত্যক্ত বা ঢিল মারা যাবেনা।
- পাখি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী শিকার করা যাবেনা।
- বিলের কোন সম্পদ নষ্ট করা ও আহরণ করা যাবেনা।
- উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের কোন ক্ষতি করা যাবেনা।
- বিলের ভিতর দিয়ে নৌকা চালানো/ব্যবহার করা যাবেনা।
- বিলের ভিতর খালি পথে (গরু, মহিষ) চরানো যাবেনা।
- বনের ভিতরে আগুন জ্বালানো যাবেনা।
- রাসায়নিক বর্জ্য না ফেলা বা পরিবেশ দূষণ না করা।
- নির্দিষ্ট এলাকায় মধ্যে অবস্থান বা চলাচল না করা।
- কোন অসামাজিক কার্যকলাপ করা যাবেনা।
আশেপাশে আর কী দেখবেন
শ্রীমঙ্গল এলে বাইক্কা বিলের সাথে আরও কয়েকটা জায়গা একসাথে ঘুরে নেওয়া যায় এবং সেটাই স্মার্ট পরিকল্পনা বলে মনে করি।
- লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
- মাধবপুর লেক
- চা বাগান
- হামহাম জলপ্রপাত
- মাধবকুন্ড জলপ্রপাত
ফেসবুক: GoArif
