পিরামিডের (Pyramid) নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মরুভূমির বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাথরের স্তূপ। হাজার বছর ধরে যা মানুষের কৌতূহল আর বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র পিরামিডই আজও টিকে আছে। কিন্তু আসলে পিরামিড কী? কেন তৈরি হয়েছিল এই বিশাল স্থাপনা? কীভাবে তৈরি হলো এমন অসাধ্য কাজ? আসুন জেনে নেওয়া যাক পিরামিডের পুরো ইতিহাস।
আরও: শিক্ষা সফর কাকে বলে
পিরামিড কী
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পিরামিড হলো বিশাল আকারের একটি স্থাপনা যার চারটি ত্রিভুজাকার দেয়াল একটি কেন্দ্রীয় বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। ভূমি থেকে দেখলে এর আকৃতি দেখতে অনেকটা ত্রিভুজের মতো মনে হয়।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত পিরামিডগুলো মিসরে অবস্থিত। এগুলো ইট বা পাথরের তৈরি বিশাল স্থাপনা, যার মাঝে কিছু কিছু বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থাপনা হিসেবে পরিগণিত। আর এগুলো শুধু সাধারণ স্থাপনা নয় এগুলো আসলে প্রাচীন মিসরের রাজা ফারাওদের সমাধিক্ষেত্র।
পিরামিড কেন তৈরি করা হয়েছিল
প্রাচীন মিসরের শাসনকর্তা ফারাওদের মৃত্যুর পর তাদের সমাহিত করা হতো এই বিশাল সমাধিক্ষেত্রে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এত বড় আর জাঁকজমকপূর্ণ সমাধি?
এর পেছনে ছিল প্রাচীন মিসরীয়দের একটি গভীর বিশ্বাস। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতো, মৃত্যুর পরও মানুষের আত্মা বেঁচে থাকে এবং তারা পরবর্তী জীবনে প্রবেশ করে। এই পরবর্তী জীবনে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, যাতে জীবনটাকে উপভোগ করা যায়, সেই চিন্তায় মিসরীয়রা অস্থির থাকতো।
মৃতদেহ সংরক্ষণের গুরুত্ব
মিসরীয়রা বিশ্বাস করতো, লাশ বা মৃতদেহ টিকে থাকলেই কেবল আত্মা পরবর্তী জীবনে ফিরে আসতে পারবে। তাই তারা মৃতদেহকে বিশেষ কায়দায় ‘মমি’ বানিয়ে রাখতো। আর এই মমি সংরক্ষণের জন্য দরকার ছিল এমন একটি স্থান যেখানে কেউ সহজে ঢুকতে পারবে না।
শক্ত পিরামিডের ভেতরে রাখলে কেউ মমিকে ধ্বংস করা তো দূরের কথা, ছুঁতেও পারবে না এটাই ছিল তাদের ভাবনা। এতে মৃতদেহ বহুদিন অক্ষত থাকবে এবং ফারাওরা আবার একদিন জীবন ফিরে পাবেন।
ক্ষমতার প্রতীক
পিরামিড শুধু সমাধিই নয়, এটি ছিল ফারাওদের ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীকও। ব্যক্তির গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে গুরুত্ব আরোপ করা হতো এ ব্যাপারে। ব্যক্তি যতো গুরুত্বপূর্ণ হতো, সমাধিক্ষেত্র ততো বড় হতো।
ক্ষমতায় আসার পর নতুন ফারাওয়ের প্রথম কাজই ছিল নিজের পিরামিড নির্মাণ শুরু করা। প্রত্যেকেই চাইতেন বিশাল আয়তনের হোক তার সমাধিক্ষেত্র। অনেকেই মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সমাধিক্ষেত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যেতেন।
আরও: থাইল্যান্ড ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
প্রথম পিরামিড কীভাবে তৈরি হলো
ইতিহাসের প্রথম পিরামিড নির্মাণ করেছিলেন প্রাচীন মিসরীয়রা। আজ থেকে প্রায় ৪,৭০০ বছর আগে মিসরে তৈরি হয়েছিল স্টেপ পিরামিড। মজার ব্যাপার হলো, এই পিরামিড তৈরির আগে মিসরে কখনো পাথরের বাড়িও তৈরি হয়নি!
জোসারের পিরামিড
ফারাও জোসার সবার থেকে ভিন্ন হওয়ার জন্য এমন কিছু একটা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা অন্য কারও নেই। কিন্তু কী তৈরি করবেন, তা তিনি জানতেন না। দায়িত্ব দিলেন তখনকার সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ব্যক্তিকে, নাম ইমহোটেপ।
ইমহোটেপ তৈরি করলেন ইতিহাসের প্রথম পিরামিড, স্টেপ পিরামিড। এখন এটি জোসারের পিরামিড নামে পরিচিত। এই পিরামিডটি ১৯৭ ফুট লম্বা ছিল এবং মূলত মেমফিসের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সাক্কারায় নির্মিত হয়েছিল।
পিরামিড নির্মাণের আগে মিসরীয়দের কবর দেয়ার পদ্ধতি ভিন্ন ছিল। তখন সমাধি দেয়া হতো চারকোনা ছোট আকৃতির ঘরে, যার নাম ছিল ‘মাস্তাবা’। ইমহোটেপ মূলত একটার উপর আরেকটা মাস্তাবা সাজিয়ে ধাপে ধাপে তৈরি করলেন প্রথম পিরামিড।
গিজার গ্রেট পিরামিড
মিসরে মোট ৭৫টি ছোটবড় পিরামিড আছে। তবে সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় হচ্ছে গিজার পিরামিড, যা খুফুর পিরামিড হিসেবেও পরিচিত। এটিই প্রাচীন বিশ্বের সাতটি আশ্চর্য বস্তুর মধ্যে একমাত্র যা আজও বিদ্যমান।
খুফুর পিরামিডের তথ্য
চতুর্থ রাজবংশের দ্বিতীয় ফারাও খুফু (যিনি গ্রিক ভাষায় Cheops নামে পরিচিত) এই পিরামিড নির্মাণ করেছিলেন। পিরামিডটি বর্তমান মিসরের রাজধানী কায়রো শহরের পশ্চিম দিকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
আকার ও উচ্চতা:
- মূল উচ্চতা ছিল প্রায় ১৪৬.৬ মিটার (৪৮১ ফুট)
- হাজার বছরের ক্ষয়ে এখন উচ্চতা প্রায় ১৩৮ মিটার
- প্রতিটি পাশের দৈর্ঘ্য ২৩০ মিটার
- ৭৫৫ বর্গফুট জমির উপর স্থাপিত
নির্মাণ উপকরণ:
- প্রায় ২৩ লক্ষ পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি
- প্রতিটি পাথরের গড় ওজন প্রায় ২.৫ টন
- কিছু পাথরের ওজন ৮০ টন পর্যন্ত
- মোট ওজন প্রায় ৬০ লক্ষ টন (যা বর্তমানের বুর্জ খলিফার চেয়ে ১২ গুণ বেশি ভারী!)
নির্মাণ সময়:
- সময় লেগেছিল প্রায় ২০ বছর
- শ্রমিক খেটেছিল আনুমানিক ১ লাখ
- নির্মিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৫৬০ অব্দে
গিজা পিরামিড কমপ্লেক্সে তিনটি প্রধান পিরামিড রয়েছে খুফু, খাফরে এবং মেনকাউরে। তিনটিই এক সারিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বছরের পর বছর।
পিরামিড কীভাবে তৈরি হয়েছিল
এটাই সবচেয়ে বড় রহস্য। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই কীভাবে এত বিশাল স্থাপনা তৈরি করা সম্ভব হলো? ক্রেন বা তেমন কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি তো ছিল না। এমনকি চাকাও তখন আবিষ্কৃত হয়নি!
পাথর সংগ্রহ ও পরিবহন
পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল বিশাল বিশাল পাথর খণ্ড দিয়ে। পাথরগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল দূরদূরান্তের পাহাড় থেকে। এক একটি পাথরের ওজন ছিল প্রায় ৬০ টন, আর দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ থেকে ৪০ ফুটের মতো।
চার হাজার বছরের পুরানো এক সমাধিতে অঙ্কিত এক চিত্রে দেখা যায়, একটি বিশাল স্তম্ভকে স্লেজে করে সরানো হচ্ছে। অনেক মানুষ রশি দিয়ে সেই স্লেজ টেনে নিচ্ছে। আর তাদের মধ্যে একজন পাত্র থেকে জল ঢালছে বালির উপরে। এতে ঘর্ষণ প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক গবেষণা
সম্প্রতি ফ্রান্সের সিইএ প্যালিওটেকনিক ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্যে একটি চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেছেন। জোসারের পিরামিডের পাশে ‘গিসর এল-ঘের’ নামে একটি অবকাঠামো ছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, এই অবকাঠামো আসলে একসময় বাঁধ হিসেবে কাজ করেছে। নিকটবর্তী নদীর পানি এই বাঁধের সাহায্যে আটকে রাখা হতো, যা পাথর পরিবহনে সাহায্য করেছিল।
নির্মাণ পদ্ধতি
পাথরের সাথে পাথর জোড়া দিয়ে পিরামিড তৈরি করা হতো। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, কীভাবে এত উঁচুতে পাথর তোলা হলো? এটা নিয়ে এখনও নানা তত্ত্ব আছে:
- কেউ বলেন র্যাম্প বা ঢালু পথ তৈরি করে পাথর উপরে তোলা হতো
- কেউ বলেন ভেতর থেকে সিঁড়ি তৈরি করে একটার উপর আরেকটা বসানো হতো
- কেউ মনে করেন কাঠের ক্রেন জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল
যাই হোক, সঠিক পদ্ধতিটা আজও পুরোপুরি জানা যায়নি।
পিরামিডের ভেতরে কী আছে
পিরামিডের ভেতরে রয়েছে জটিল সব প্যাসেজ, কক্ষ এবং গোপন পথ। মূল উদ্দেশ্য ছিল ফারাওর মমি এবং তার সাথে দেওয়া সম্পদ সুরক্ষিত রাখা।
সমাধি কক্ষ
পিরামিডের কেন্দ্রে থাকতো ফারাওর সমাধি কক্ষ। সেখানে মমি রাখা হতো সোনার তৈরি বিশেষ কফিনে। কক্ষের চারপাশে সাজিয়ে রাখা হতো নানা ধরনের সম্পদ স্বর্ণ, রত্ন, খাবার, আসবাবপত্র, এমনকি দাস-দাসীদের মমিও!
মিসরীয়রা বিশ্বাস করতো, পরকালে এসব জিনিসের দরকার হবে। তাই ফারাওর পছন্দের সব কিছুই পিরামিডে রাখা হতো।
সুরক্ষা ব্যবস্থা
তখনকার রাজমিস্ত্রিরা এমন কৌশলে পিরামিড বানিয়েছিলেন যে সহজে কেউ যেন সেখানে প্রবেশের রাস্তা না পান। মিথ্যা দরজা, গোপন প্যাসেজ, পাথরের ফাঁদ নানা কৌশল ছিল চোরদের ঠেকাতে।
তবে দুর্ভাগ্যবশত, সময়ের সাথে সাথে অনেক পিরামিডই ডাকাতদের হাতে লুট হয়েছে। ফারাওদের সেই আশা পূরণ হয়নি মানুষ মমিকে স্পর্শ করতে পেরেছে এবং তা পিরামিড থেকে এনে জাদুঘরে রেখেছে।
আরও: ট্রাভেল পারমিট কি
পৃথিবীর অন্যান্য পিরামিড
অনেকেই মনে করেন পিরামিড শুধু মিসরে আছে। কিন্তু না, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পিরামিড পাওয়া গেছে।
মেক্সিকোর চোলুলার গ্রেট পিরামিড
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিড (আয়তনের দিক থেকে) হলো মেক্সিকোর চোলুলার গ্রেট পিরামিড। মিসরের গ্রেট পিরামিডের চেয়ে এর উচ্চতা কম হলেও এটি অনেক বেশি প্রশস্ত। এর আয়তন প্রায় ৩৩ লাখ ঘনমিটার। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের মতেও এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় পিরামিড।
মেসোআমেরিকান পিরামিড
চিচেন ইতজায় বেশ কিছু মেসোআমেরিকান সংস্কৃতি পিরামিড-আকৃতির কাঠামো তৈরি করেছে। এগুলো সাধারণত ধাপে ধাপে তৈরি ছিল, যার উপরে মন্দির থাকতো। মিসরীয় পিরামিডের তুলনায় এগুলো মেসোপটেমিয়ান জিগুরাটের সাথে বেশি মিল রয়েছে।
চীনের পিরামিড
চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং-কে আধুনিক দিনের শিয়ানের বাইরে একটি বড় ঢিবির নিচে সমাহিত করা হয়েছিল। পরবর্তী শতাব্দীতে হান রাজবংশের রাজপরিবারের সদস্যদেরও মাটির সমতল-শীর্ষ পিরামিডের নীচে সমাহিত করা হয়েছিল।
পিরামিড নিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য
১. নির্ভুল নির্মাণ: গ্রেট পিরামিডের চারটি পাশ প্রায় নিখুঁতভাবে চার দিকে (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম) মুখ করে আছে। এই নির্ভুলতা আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই অর্জিত হয়েছিল!
২. তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: পিরামিডের ভেতরের তাপমাত্রা সবসময় প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকে, বাইরের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন।
৩. ভারী কিন্তু স্থিতিশীল: ৬০ লাখ টন ওজন নিয়েও পিরামিড হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে ভূমিকম্প সহ্য করে।
৪. চুনাপাথরের আবরণ: মূলত পিরামিডের বাইরে চকচকে সাদা চুনাপাথরের আবরণ ছিল, যা সূর্যের আলোতে ঝকঝক করত। কালের বিবর্তনে এই আবরণ ক্ষয়ে গেছে।
৫. শ্রমিকদের জীবন: আগে মনে করা হতো দাসরা পিরামিড তৈরি করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, পেশাদার শ্রমিকরা এটি নির্মাণ করেছিলেন এবং তাদের খাওয়া-দাওয়া ও বাসস্থানের সুব্যবস্থা ছিল।
পিরামিডের রহস্য
এত বছর পরেও পিরামিড নিয়ে অনেক রহস্য রয়ে গেছে:
- কীভাবে এত নিখুঁতভাবে পাথর কাটা ও স্থাপন করা হলো?
- কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল?
- আসলেই কি ১ লাখ শ্রমিক কাজ করেছিল, নাকি সংখ্যাটা কম বা বেশি?
- পিরামিডের ভেতরে কি এখনও অনাবিষ্কৃত কক্ষ আছে?
বিজ্ঞানীরা আজও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে। পিরামিড শুধু পাথরের স্তূপ নয়, এটি মানব সভ্যতার অসাধারণ এক নিদর্শন। প্রাচীন মিসরীয়দের প্রকৌশল জ্ঞান, শিল্পকলা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক সংগঠনের এক জীবন্ত উদাহরণ এই পিরামিড। হাজার বছর আগে যারা এই বিশাল স্থাপনা তৈরি করেছিলেন, তারা হয়তো জানতেন না যে তাদের সৃষ্টি এতদিন টিকে থাকবে। কিন্তু আজও মরুভূমির বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পিরামিড, সাক্ষী হয়ে আছে মানুষের অসীম সৃজনশীলতা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির।
পিরামিড আমাদের শেখায়, মানুষ চাইলে অসাধ্য সাধন করতে পারে। প্রযুক্তি না থাকলেও জ্ঞান, পরিশ্রম আর সংকল্প দিয়ে এমন কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব, যা হাজার বছর পরও বিস্ময় জাগায়। এটাই পিরামিডের আসল বার্তা, মানুষের সামর্থ্যের কোনো সীমা নেই।
ফেসবুক: GoArif
