রাজশাহী কলেজ (Rajshahi College) শুধুমাত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের একটি জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ। ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি দেশের তৃতীয় প্রাচীন কলেজ হিসেবে পরিচিত। রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্র সাহেব বাজার এলাকায় অবস্থিত প্রায় ৩৫ একর জমির বিশাল ক্যাম্পাসটি তার ঐতিহাসিক স্থাপত্য, সবুজ প্রাঙ্গণ এবং সমৃদ্ধ একাডেমিক ঐতিহ্যের জন্য দর্শনার্থীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্থান।
এই কলেজ শুধু শিক্ষার আলো ছড়ায়নি, বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত লাল ইটের প্রাচীন ভবন, সবুজ উদ্যান এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভগুলো ইতিহাস প্রেমী এবং ফটোগ্রাফারদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
কলেজে যা যা দেখবেন
- প্রশাসনিক ভবন: ১৮৮৪ সালে নির্মিত দ্বিতল লাল রঙের প্রধান প্রশাসনিক ভবন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ৬৭,৭০০ টাকা ব্যয়ে একজন দক্ষ ব্রিটিশ প্রকৌশলী কর্তৃক পরিকল্পিত এই ভবনের কাঠের তৈরি খিলান এবং চৈনিক স্থাপত্যের সংমিশ্রণ দর্শকদের মুগ্ধ করে।
- হাজী মোহাম্মদ মহসিন ভবন: ১৮৮৮ সালে রাজশাহী মাদ্রাসা নামে নির্মিত এই ভবনটি পরে গ্যালারি-১৭ এ রূপান্তরিত হয়। হাজী মোহাম্মদ মহসিনের দানে নির্মিত এই ঐতিহাসিক ভবন অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর ধারক।
- মোহাম্মাদান ফুলার হোস্টেল: ১৯০৯ সালে নির্মিত এই সুন্দর ভবনটি বর্তমানে বাংলা, ব্যবস্থাপনা, হিসাববিজ্ঞান, উর্দু, সংস্কৃত, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং অর্থনীতি বিভাগের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
- ভাষা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পরপরই শিক্ষার্থীরা প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। বর্তমান স্মৃতিস্তম্ভটি ১৯৭৩ সালে নির্মিত হয়।
- পিএন হোস্টেল: ১৮৯৪ সালে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কলেজের প্রথম ছাত্রাবাস।
- হেমন্তকুমারী হোস্টেল: ১৯০২ সালে পুঠিয়ার রাণী হেমন্তকুমারীর অর্থায়নে নির্মিত।
- বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল: প্রশাসনিক ভবনের পাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ম্যুরাল স্থাপিত রয়েছে।
- রবীন্দ্র-নজরুল চত্বর: ক্যাম্পাসে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের স্মরণে নির্মিত একটি সুন্দর চত্বর।
আরও: ভীমের জাঙ্গাল
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সড়কপথে:
- বাস সার্ভিস: মহাখালী, আব্দুল্লাহপুর, গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে গ্রীন লাইন, একতা, শ্যামলি, হানিফ, ন্যাশনাল ট্রাভেলস এর এসি/নন-এসি বাস
- সময়: প্রায় ৫-৬ ঘন্টা
- ভাড়া: ৫০০-১২০০ টাকা (এসি/নন-এসি ভেদে)
ঢাকা থেকে রেলপথে:
- ট্রেন: সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস, ধুমকেতু এক্সপ্রেস, বনলতা এক্সপ্রেস
- সময়: প্রায় ৬-৭ ঘন্টা
- ভাড়া: ৩০০-১৫০০ টাকা (শ্রেণী ভেদে)
ঢাকা থেকে আকাশপথে:
- রাজশাহীতে শাহ মাকদুম বিমানবন্দর রয়েছে। ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করে।
রাজশাহী শহর থেকে কলেজে:
রাজশাহী শহরের যেকোনো স্থান থেকে রিকশা, সিএনজি অথবা স্থানীয় বাসে সাহেব বাজার রোডে অবস্থিত রাজশাহী কলেজে সহজেই পৌঁছানো যায়।
ঠিকানা: Rajshahi College, Saheb Bazar Road, Rajshahi-6100
যোগাযোগ:
ফোন: +88 02588855475 (Principal)
+88 02588850080 (Office)
+88 02588850067 (Admission Section)
ইমেইল: [email protected], [email protected]
আরও: মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর
কোথায় থাকবেন
রাজশাহী শহরে বিভিন্ন বাজেটের অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে।
গ্র্যান্ড রিভারভিউ হোটেল
- রাজশাহীর প্রথম চার তারকা মানের হোটেল
- ঠিকানা: কাজিহাটা, এমডোহ রোড, রাজশাহী
- সুবিধা: সুইমিং পুল, জিম, রেস্টুরেন্ট, সিনেপ্লেক্স, কনফারেন্স হল
- ভাড়া: ৬০০০-১৫০০০ টাকা
- ফোন: 01784-400600
রয়্যাল রাজ হোটেল অ্যান্ড কনডোমিনিয়াম
- ঠিকানা: গণকপাড়া, রাজশাহী
- সুবিধা: রুফটপ সুইমিং পুল, স্পা সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে
- ভাড়া: ৫৫৫০-১৪৪০০ টাকা
- ফোন: 01700-000000
যাত্রা ফ্লাগশিপ রাজশাহী সিটি সেন্টার
- ঠিকানা: বাড়ি-৫২, সড়ক-৪, পদ্মা আবাসিক, রাজশাহী
- ফোন: 01700706951
- ইমেইল: [email protected]
ওয়ারিশান রেসিডেন্সিয়াল হোটেল
- ঠিকানা: জিরো পয়েন্ট, সাহেব বাজার, রাজশাহী
- সুবিধা: রেস্টুরেন্ট, কনফারেন্স রুম
- ভাড়া: ৩৫০০-৯৫০০ টাকা
হোটেল স্টার ইন্টারন্যাশনাল
- ঠিকানা: আমচত্তর, নওদাপাড়া, রাজশাহী
- সুবিধা: রেস্টুরেন্ট, 3D সিনেমা জোন
- ভাড়া: ৩০০০-৯০০০ টাকা
- ফোন: 02588862563, 01784-400700
পর্যটন মোটেল
- ঠিকানা: আব্দুল মজিদ রোড, শ্রীরামপুর, রাজশাহী
- সুবিধা: রেস্টুরেন্ট, কনফারেন্স হল, ফ্রি ওয়াইফাই
- ভাড়া: ৩২০০-১২০০০ টাকা
- ফোন: 0721-775040
হোটেল হক ইন্টারন্যাশনাল
- ঠিকানা: জিরো পয়েন্ট, রাজশাহী
- সুবিধা: এসি/নন-এসি রুম, ফ্রি ওয়াইফাই
- ভাড়া: ১৫০০-৩০০০ টাকা
হোটেল আল আরাফাহ
- ঠিকানা: নিউ মার্কেট সংলগ্ন, রাজশাহী
- ভাড়া: ২০০০-৬০০০ টাকা
আরও: খেরুয়া মসজিদ
কোথায় খাবেন
রাজশাহী শহরে বিভিন্ন ধরনের খাবারের জন্য অনেক রেস্টুরেন্ট রয়েছে।
গ্র্যান্ড রিভারভিউ হোটেল রেস্টুরেন্ট
- বিশেষত্ব: কাবাব, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, ইলিশ মাছ, চাইনিজ খাবার
- ঠিকানা: কাজিহাটা, রাজশাহী
- শুক্রবার বিশেষ ব্যুফে
মাস্টারশেফ (চাইনিজ)
- বিশেষত্ব: হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, গ্রিল, কাশ্মীরি নান
- ঠিকানা: অলোকার মোড়, রাজশাহী
- প্রতিষ্ঠা: ২০১১ সাল
হোটেল রহমানিয়া
- বিশেষত্ব: বাংলা খাবার, গরু ও খাসির মাংস
- ঠিকানা: গণকপাড়া, রাজশাহী
- প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৭ সাল (সবচেয়ে পুরনো)
মেমোরি রেস্টুরেন্ট
- বিশেষত্ব: গরু ও মুরগির মাংস, সন্ধ্যার নাস্তা
- ঠিকানা: জিরো পয়েন্ট, বাজার, রাজশাহী
মাইডাস রেস্টুরেন্ট
- বিশেষত্ব: থাই স্যুপ, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, চিকেন মাশালা
- ঠিকানা: সুলতানাবাদ, রাজশাহী
হাংরি হিরোস
- ফাস্ট ফুড ও স্ন্যাকসের জন্য জনপ্রিয়
হাইডআউট ক্যাফে
- তরুণদের আড্ডার জন্য আদর্শ স্থান
বাজেট খাবার
সাহেব বাজার, নিউ মার্কেট এবং গণকপাড়া এলাকায় অনেক সাশ্রয়ী মূল্যের খাবারের হোটেল রয়েছে যেখানে ৫০-২০০ টাকায় ভালো খাবার পাওয়া যায়।
কিছু দরকারি টিপস
- অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীত এবং বসন্তকাল ভ্রমণের জন্য আদর্শ সময়।
- কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখুন। সাধারণত কর্মদিবসে অফিস সময়ে অনুমতি পাওয়া সহজ।
- ঐতিহাসিক ভবনগুলোর ছবি তোলার জন্য সকাল বা বিকেল সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সূর্যের আলোতে লাল ইটের ভবনগুলো অসাধারণ দেখায়।
- শালীন পোশাক পরিধান করুন কারণ এটি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
- ক্যাম্পাসের ইতিহাস ভালোভাবে জানতে কোনো প্রবীণ শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের সাহায্য নিতে পারেন।
- ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা রক্ষীরা আছেন। তাদের নির্দেশনা মেনে চলুন।
- রাজশাহী কলেজের পাশেই বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল অবস্থিত। একসাথে দেখতে পারেন।
- ক্যাম্পাসের বাইরে অনেক খাবারের দোকান আছে। তবে হাইজিনিক খাবারের জন্য ভালো রেস্টুরেন্ট বেছে নিন।
- কলেজের পাশে পুরনো বইয়ের দোকান আছে যেখানে দুর্লভ বই পাওয়া যায়।
- কলেজ অফিসের নম্বর সংরক্ষণ করে রাখুন জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য।
- ক্যাম্পাস পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করুন। ময়লা ডাস্টবিনে ফেলুন।
- টি-বাঁধ, পদ্মা গার্ডেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাঘা মসজিদ এবং পুঠিয়া রাজবাড়ী রাজশাহীর অন্যান্য দর্শনীয় স্থান।
কলেজ নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
রাজশাহী কলেজে প্রবেশের জন্য কি টিকিট লাগে?
না, রাজশাহী কলেজ একটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য কোনো টিকিট লাগে না। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া উচিত।
কলেজ ক্যাম্পাস কখন খোলা থাকে?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। ভ্রমণের আগে অফিসে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হয়ে নিন।
রাজশাহী কলেজ কত সাল প্রতিষ্ঠিত হয়?
রাজশাহী কলেজ ১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের তৃতীয় প্রাচীন কলেজ।
রাজশাহী কলেজ থেকে বরেন্দ্র মিউজিয়াম কতদূর?
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী কলেজের একদম কাছে, হেঁটে ৫-১০ মিনিটের দূরত্বে। একই দিনে উভয় স্থান ঘুরে দেখতে পারবেন।
পার্কিং সুবিধা আছে কি?
হ্যাঁ, কলেজের প্রবেশপথে গাড়ি পার্কিং এর ব্যবস্থা আছে। তবে ব্যস্ত সময়ে জায়গা কম থাকতে পারে।
একদিনে রাজশাহীর কোন কোন স্থান দেখা সম্ভব?
একদিনে রাজশাহী কলেজ, বরেন্দ্র মিউজিয়াম, পদ্মা গার্ডেন এবং টি-বাঁধ সহজেই ঘুরে দেখা যায়। ভালো পরিকল্পনা করলে পুঠিয়া রাজবাড়ী বা বাঘা মসজিদও যুক্ত করতে পারবেন।
ফেসবুক: GoArif
