প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্য ঢাকার একদম কাছে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক (Bangabandhu Safari Park) বা গাজীপুর সাফারী পার্ক (Gazipur Safari Park) একটি আদর্শ গন্তব্য। থাইল্যান্ডের সাফারি ওয়ার্ল্ডের অনুকরণে নির্মিত এই পার্কটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সাফারি পার্ক। এখানে আপনি পাবেন রোমাঞ্চকর বন্যপ্রাণী দর্শন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে এক অবিস্মরণীয় দিন কাটানোর সুযোগ।
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নে অবস্থিত একটি বিশাল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পর্যটন কেন্দ্র। প্রায় ৩,৬৯০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্কটি ছোট ছোট টিলা এবং ঘন শালবন দিয়ে সমৃদ্ধ। ভাওয়াল গড়ের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যময় পরিবেশে গড়ে ওঠা এই সাফারি পার্কে রয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী।
আরও: তামান্না ওয়ার্ল্ড ফ্যামিলি পার্ক
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাঘের বাজার নামক স্থান থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে এই সাফারি পার্কের অবস্থান।
সম্পূর্ণ ঠিকানা: বড় রাথুরা মৌজা, মাওনা ইউনিয়ন, শ্রীপুর উপজেলা, গাজীপুর
যাতায়াত ব্যবস্থা
ঢাকা থেকে বাসে:
- ঢাকার মহাখালী, গাবতলী, কল্যাণপুর বা মিরপুর থেকে শ্রীপুর, ভালুকা বা ময়মনসিংহগামী যেকোনো বাসে উঠুন
- গাজীপুর চৌরাস্তা পেরিয়ে বাঘের বাজার নামুন (বাস ভাড়া: সাধারণ সিট ৫০ টাকা, সিটিং সার্ভিস ৮০ টাকা)
- বাঘের বাজার থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় (২০-৪০ টাকা) সরাসরি সাফারি পার্কে পৌঁছান
- সময় লাগবে: প্রায় ১-১.৫ ঘণ্টা
নিজস্ব গাড়িতে:
- ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে গাজীপুর হয়ে বাঘের বাজার পর্যন্ত যান
- বাঘের বাজারে সাফারি পার্কের বিশাল সাইনবোর্ড দেখতে পাবেন
- সেখান থেকে পশ্চিমে ৩ কিলোমিটার গেলেই পার্কের প্রধান ফটক
- পার্কে যথেষ্ট পার্কিং সুবিধা রয়েছে
অন্যান্য জেলা থেকে: প্রথমে গাজীপুর চৌরাস্তায় আসুন, তারপর বাঘের বাজার হয়ে সাফারি পার্কে যান।
খোলা থাকার সময় ও সাপ্তাহিক বন্ধ
- খোলা থাকে: সপ্তাহের ৬ দিন (রবিবার থেকে শনিবার – মঙ্গলবার ছাড়া)
- সময়: সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত
- সাপ্তাহিক বন্ধ: প্রতি মঙ্গলবার
পরামর্শ: পুরো পার্ক ঘুরে দেখতে ১০-১২ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তাই সকাল সকাল পৌঁছানো উত্তম। দুপুরের খরতাপ এড়াতে শীতকাল ভ্রমণের জন্য আদর্শ সময়।
প্রবেশ মূল্য ও টিকেট তথ্য
পার্কে প্রবেশ টিকেট (মূল গেট)
- প্রাপ্তবয়স্ক (১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব): ৫০ টাকা
- অপ্রাপ্তবয়স্ক (১২-১৮ বছর): ২০ টাকা
- শিক্ষার্থী (স্টুডেন্ট আইডি কার্ড সহ): ১০ টাকা
- ৫ বছরের কম বয়সী শিশু: বিনামূল্যে
- বিদেশি পর্যটক: ১০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১,০০০ টাকা)
কোর সাফারি টিকেট (মিনিবাস/জিপ সাফারি)
- প্রাপ্তবয়স্ক: ১৫০ টাকা
- অপ্রাপ্তবয়স্ক ও ছাত্র-ছাত্রী: ৫০ টাকা
- ৫ বছরের কম বয়সী শিশু: বিনামূল্যে
- সময়: প্রায় ২০ মিনিট
অন্যান্য টিকেট
- পার্কের বিভিন্ন ইভেন্ট/স্পট: ২০ টাকা করে
- প্যাডেল বোট (৩০ মিনিট): প্রাপ্তবয়স্ক ২০০ টাকা, শিশু ১০০ টাকা
- শিশু পার্কের রাইড: ২০-৫০ টাকা
- সব স্পট মিলিয়ে: ২০০-৩০০ টাকা (কম্বো প্যাকেজ পাওয়া যায়)
গাড়ি পার্কিং ফি
- মোটরসাইকেল: ২৫ টাকা
- প্রাইভেট কার: ১০০ টাকা
- মিনিবাস/মাইক্রোবাস: ২০০ টাকা
- বাস/কোস্টার: ৪০০ টাকা
আনুমানিক মোট খরচ: একজন প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থীর সব কিছু মিলিয়ে ৯০০-১২০০ টাকা খরচ হতে পারে (খাবার সহ)।
পার্কের বিভিন্ন অংশ ও দর্শনীয় স্থান
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ককে মূলত ৫টি প্রধান অংশে ভাগ করা হয়েছে:
বঙ্গবন্ধু স্কয়ার (৩৮ একর)
পার্কে প্রবেশের সাথে সাথেই আপনি বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে পৌঁছাবেন। এটি পার্কের প্রশাসনিক ও বিনোদন কেন্দ্র।
এখানে রয়েছে:
- বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন প্রধান ফটক (আকর্ষণীয় ম্যুরাল ও মডেল সজ্জিত)
- পার্কিং এলাকা
- বিনোদন উদ্যান
- প্রশাসনিক ভবন
- ডিসপ্লে ম্যাপ (পুরো পার্কের রাস্তা ও দর্শনীয় স্থানের মানচিত্র)
- পার্ক অফিস ও তথ্যকেন্দ্র
- বিশ্রামাগার ও ডরমেটরি (আগাম বুকিং প্রয়োজন)
- নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়াম
- ইকো-রিসোর্ট (থাকার ব্যবস্থা)
- সুন্দর ফোয়ারা ও লেক
- সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি (ডাইনোসর, বাঘ, সিংহ ইত্যাদি)
কোর সাফারি (১,২১৭ একর)
এটি সাফারি পার্কের প্রধান আকর্ষণ এবং সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশ। এই বিশাল এলাকায় বন্যপ্রাণীগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশে খোলামেলাভাবে বিচরণ করে।
বিশেষত্ব:
- এখানে গাড়ি ছাড়া পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
- পার্ক কর্তৃপক্ষের মিনিবাস বা জিপে করে ঘুরতে হয়
- নির্দিষ্ট রুটে প্রায় ২০ মিনিটের একটি সাফারি ট্যুর
- চলন্ত গাড়ি থেকে নামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (নিরাপত্তার জন্য)
যে প্রাণী দেখা যায়:
- রয়েল বেঙ্গল টাইগার (বাঘ) – ৮টি
- সিংহ – ৪টি (সাদা সিংহসহ)
- কালো ভাল্লুক – ১৪টি
- আফ্রিকান চিতা
- চিত্রা হরিণ – ১৫০টি
- সাম্বার হরিণ – ৬টি
- মায়া হরিণ – ৬টি
- প্যারা হরিণ
- গয়াল – ১১টি
- এশিয়ান হাতি
- জেব্রা – ৩০টি
- জিরাফ – ২টি
- নীলগাই – ১২টি
অভিজ্ঞতা: মিনিবাসে বসে চারপাশে বাঘ, সিংহ, হরিণ দেখার অনুভূতি অসাধারণ। হয়তো হঠাৎ একটি বাঘ রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে পড়বে, কিংবা জানালার কাছে এসে সিংহ গর্জন দিয়ে উঠবে – এমন রোমাঞ্চকর মুহূর্ত শুধু এখানেই সম্ভব!
সাফারি কিংডম (৫৫৬ একর)
এটি পার্কের আরেকটি প্রধান অংশ যেখানে পায়ে হেঁটে বা পার্কের বাসে করে ঘুরতে পারবেন।
প্রধান আকর্ষণ:
ম্যাকাও ল্যান্ড:
- আফ্রিকা থেকে আনা প্রায় ৩৪ প্রজাতির রঙিন পাখি
- নীল-সোনালি ম্যাকাও
- সবুজ ম্যাকাও
- আফ্রিকান গ্রে প্যারট
- বিভিন্ন প্রজাতির টিয়া – ২০০টি
- পেলিকান
- লুটিনো রিংনেক প্যারট
মেরিন অ্যাকুরিয়াম:
- প্রায় ২০ প্রজাতির বিরল মাছ
- টাইগার ফিশ
- ক্রোকোডিল ফিশ
- অস্কার
- ব্ল্যাক গোস
- চিকলেট মাছ (যা ২০ সেকেন্ড পর পর রং বদলায়)
প্রজাপতি সাফারি:
- প্রায় ২৬ প্রজাতির রঙিন প্রজাপতি
- প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রজাপতির উড়াউড়ি
ধনেশ পাখিশালা:
- আট প্রজাতির বিরল পাখি
- ফিজেন্ট ধনেশ
- ফ্লেমিংগো
- ব্ল্যাক সোয়ান
- মান্ডারিন ডাক
- উটপাখি – ১১টি
- ক্রাউন ক্রেইন
- মদনটাক – ৮টি
অন্যান্য সুবিধা:
- প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র (পুরো পার্কের উপর থেকে দৃশ্য)
- ফ্যান্সি কার্প গার্ডেন
- জিরাফ ফিডিং স্পট (জিরাফকে খাবার দেওয়ার সুযোগ)
- অর্কিড হাউজ
- আইল্যান্ড
- বোটিং ও লেক জোন
আফ্রিকান সাফারি পার্ক (২৪০ একর)
এই বিশেষ অংশে আফ্রিকান প্রাণীদের দেখার সুযোগ রয়েছে।
প্রাণী:
- বাঘ ও সিংহ
- সাদা সিংহ
- জেব্রা
- জিরাফ
- ওয়াল্ডিবিস্ট
- অরিক্স
- ব্ল্যাক বাক
- ভাল্লুক
বায়োডাইভার্সিটি পার্ক ও এক্সটেনসিভ এশিয়ান সাফারি
এই দুটি অংশে এশিয়ার বিলুপ্তপ্রায় ও বিরল প্রজাতির প্রাণী দেখা যায়।
উল্লেখযোগ্য প্রাণী:
- ক্ষুদ্রকায় ঘোড়া
- আলপাকা
- ওয়ালাবি (ক্যাঙ্গারু জাতীয়)
- মান্ডারিং ডাক
- বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ
খাবার ও রেস্টুরেন্ট সুবিধা
সাফারি পার্কে খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাইরে থেকে কোনো খাবার পার্কে নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
টাইগার রেস্তোরাঁ ও লায়ন রেস্তোরাঁ
এগুলো পার্কের সবচেয়ে অনন্য আকর্ষণ। এই দুটি বিশাল রেস্তোরাঁয় খাবার টেবিলে বসে খাওয়ার সময় কাচের দেয়ালের ওপাশে বাঘ বা সিংহের ঘুরে বেড়ানো দেখতে পারবেন। একদম নিরাপদ পরিবেশে বন্যপ্রাণীর সাথে এমন কাছাকাছি অবস্থানের অভিজ্ঞতা সত্যিই অবিস্মরণীয়!
খাবার মূল্য:
- দুপুরের খাবার: ২২০-৩০০ টাকা
- নাস্তা ও পানীয়: ৫০-১৫০ টাকা
অন্যান্য খাবারের ব্যবস্থা
- পার্কের প্রধান ফটকের কাছে কয়েকটি রেস্তোরাঁ আছে
- বাঘের বাজারে বেশ কিছু খাবারের দোকান রয়েছে
- পার্কের ভিতরে ক্যান্টিন সুবিধা
পরামর্শ: পর্যটন এলাকা হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি। তবে খাবারের মান ভালো এবং পরিমাণ যথেষ্ট।
কোথায় থাকবেন
যেহেতু সাফারি পার্ক ঢাকা থেকে খুব কাছে, বেশিরভাগ দর্শনার্থী দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসেন। তবে রাতযাপনের ইচ্ছা থাকলে:
- পার্কে রাত্রিযাপনের জন্য ইকো-রিসোর্ট ও ডরমেটরি আছে (আগাম বুকিং প্রয়োজন)
- গাজীপুর শহরে অনেক হোটেল ও রেস্টহাউস আছে
- বাঘের বাজার এলাকায় কিছু সাধারণ মানের হোটেল পাওয়া যায়
পর্যটকদের জন্য পরামর্শ
- সকাল সকাল পৌঁছান (সম্ভব হলে ১০টার আগেই)
- আরামদায়ক পোশাক ও হাঁটার উপযোগী জুতা পরুন
- ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন সাথে নিন (ছবি তোলার দুর্দান্ত সুযোগ)
- পর্যাপ্ত পানি সাথে রাখুন
- ছাতা বা টুপি নিতে পারেন (রোদ ও বৃষ্টির জন্য)
- পরিবারের সবার জন্য টিকেট কেটে নিন
- বিশ্রামাগার ব্যবহার করতে চাইলে আগাম বুকিং দিন
- বাঘ ও সিংহ পরিদর্শনকালে চলন্ত গাড়ি থেকে নামবেন না
- হিংস্র বন্যপ্রাণীর খাঁচার কাছে যাবেন না
- বন্যপ্রাণীদের কোনো খাবার দেবেন না
- উচ্চ শব্দ করবেন না বা মাইক বাজাবেন না
- পার্কের ভিতরে ধূমপান করবেন না
- বাইরে থেকে কোনো খাবার নিয়ে প্রবেশ করবেন না
- প্লাস্টিক বা পলিথিন যত্রতত্র ফেলবেন না (নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলুন)
- প্রাণীদের উত্যক্ত করবেন না বা পাথর ছুড়বেন না
বিশেষ সুবিধা
শিক্ষা সফর
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ গ্রুপ টিকেট:
- ৪০-১০০ জন শিক্ষার্থী: ৪০০ টাকা
- ১০০+ জন শিক্ষার্থী: ৮০০ টাকা
ট্যুর প্যাকেজ
বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি প্যাকেজ অফার করে:
- এসি বাস, নাস্তা, পানি, দুপুরের খাবার ও প্রবেশ টিকেটসহ: ১,২০০ টাকা
- পুরো বাস রিজার্ভ: ১৪,০০০ টাকা
যোগাযোগ তথ্য
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ:
- ঠিকানা: বন ভবন, আগারগাঁও, ঢাকা
- মোবাইল: ০১৯৯৯০০০০৪২
সাফারি পার্ক, গাজীপুর
- ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সহকারী বন সংরক্ষক)
- মোবাইল: ০১৭১৯২৯১০৭০
হটলাইন: ০১৭৬৯০১৮৫৮৫
আরও: আহসান মঞ্জিল
পার্কের অনন্য বৈশিষ্ট্য
- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। ভাওয়াল গড়ের শালবন ও টিলা পরিবেশে গড়ে ওঠায় এখানে প্রকৃতি দেখার এক অনন্য অনুভূতি পাবেন। সবুজ বনভূমি, পাহাড়ি পথ, ঝিরিঝিরি বাতাস এবং পাখির কলকাকলি পুরো পরিবেশকে করে তুলেছে মনোমুগ্ধকর।
- বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ: এই পার্ক শুধু পর্যটন কেন্দ্রই নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রও। বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলোকে এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে রাখা হয় এবং তাদের প্রজনন করানো হয়। পার্কে জন্ম নেওয়া নতুন প্রাণীদের যত্নে বিশেষজ্ঞ দল কাজ করে।
- শিক্ষামূলক: শিশু-কিশোরদের জন্য এটি একটি জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র। বইয়ে পড়া বা টিভিতে দেখা প্রাণীদের সামনাসামনি দেখার সুযোগ পায় তারা। নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়ামে বিভিন্ন প্রাণীর জীবনচক্র, বিবর্তন ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায়।
বিশেষ ইভেন্ট ও উৎসব
বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও বিশেষ উৎসবে পার্কে বিশেষ আয়োজন করা হয়:
- পহেলা বৈশাখ
- স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস
- আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস
- বন্যপ্রাণী সপ্তাহ
এসব সময়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা এবং বিশেষ ছাড়ও পাওয়া যায়।
নিকটবর্তী অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
সাফারি পার্ক ভ্রমণের সাথে এই এলাকার অন্যান্য স্থানও ঘুরে দেখতে পারেন:
- ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান (১৫ কিমি): পিকনিক ও প্রকৃতি ভ্রমণের জন্য আদর্শ
- গাজীপুর সাফারি পার্ক চিড়িয়াখানা (পুরাতন): ছোট কিন্তু সুন্দর
- ভাওয়াল রাজবাড়ি (২০ কিমি): ঐতিহাসিক স্থাপনা
- রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা: সুন্দর পরিবেশ
- নুহাশ পল্লী (তারাগঞ্জ): প্রকৃতি ও বিনোদন
আরও: তামান্না ওয়ার্ল্ড ফ্যামিলি পার্ক
ভ্রমণের সেরা সময়
শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি):
- সবচেয়ে আদর্শ সময়
- আবহাওয়া মনোরম ও ঠান্ডা
- হাঁটাহাঁটি করতে সুবিধা
- প্রাণীরাও বেশি সক্রিয় থাকে
বর্ষাকাল (জুন-অক্টোবর):
- প্রকৃতি সবুজ ও সতেজ
- দর্শনার্থী কম, ভিড় নেই
- তবে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে
গ্রীষ্মকাল (মার্চ-মে):
- খুব গরম, হাঁটা কষ্টকর
- তবে মধ্যাহ্নভোজের আগে বা পরে যেতে পারেন
সাপ্তাহিক পরিকল্পনা: শুক্র-শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনে খুব ভিড় হয়। রবি, সোম, বুধ বা বৃহস্পতিবার গেলে তুলনামূলক কম ভিড় পাবেন।
বাজেট পরিকল্পনা
একটি পরিবারের (২ প্রাপ্তবয়স্ক + ২ শিশু) জন্য আনুমানিক খরচ:
ন্যূনতম বাজেট:
- যাতায়াত (বাস): ৩০০ টাকা
- প্রবেশ টিকেট: ১৪০ টাকা
- কোর সাফারি: ৪০০ টাকা
- খাবার: ৮০০ টাকা
- অন্যান্য: ৩০০ টাকা
- মোট: ১,৯৪০ টাকা
মাঝারি বাজেট:
- যাতায়াত (প্রাইভেট কার): ৮০০ টাকা
- পার্কিং: ১০০ টাকা
- সব টিকেট: ১,০০০ টাকা
- খাবার: ১,৫০০ টাকা
- ছবি তোলা ও অন্যান্য: ৫০০ টাকা
- মোট: ৩,৯০০ টাকা
উচ্চ বাজেট (রাত্রিযাপনসহ):
- যাতায়াত: ১,০০০ টাকা
- থাকা (ইকো-রিসোর্ট): ৩,০০০ টাকা
- সব টিকেট ও রাইড: ১,৫০০ টাকা
- খাবার (২ দিন): ৩,০০০ টাকা
- অন্যান্য: ১,০০০ টাকা
- মোট: ৯,৫০০ টাকা
সংক্ষিপ্ত পরিকল্পনা (এক নজরে)
- সকাল ৮:৩০ টা: ঢাকা থেকে রওনা
- সকাল ১০:০০ টা: পার্কে পৌঁছানো, টিকেট কাটা
- সকাল ১০:৩০ টা: বঙ্গবন্ধু স্কয়ার ও মিউজিয়াম ঘোরা
- সকাল ১১:৩০ টা: কোর সাফারি (বাঘ-সিংহ দেখা)
- দুপুর ১২:৩০ টা: টাইগার রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার
- দুপুর ২:০০ টা: সাফারি কিংডম (ম্যাকাও, প্রজাপতি, অ্যাকুরিয়াম)
- বিকাল ৪:০০ টা: আফ্রিকান সাফারি ও বোটিং
- বিকাল ৫:০০ টা: পার্ক থেকে বের হওয়া
- সন্ধ্যা ৬:৩০ টা: ঢাকায় ফিরে আসা
সাফারি পার্ক নিয়ে প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ঠিক কোথায় অবস্থিত?
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় অবস্থিত। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজার নামক স্থান থেকে পশ্চিমে ৩ কিলোমিটার ভিতরে এই পার্কটি অবস্থিত।
সাফারি পার্ক কখন খোলা থাকে এবং সপ্তাহের কোন দিন বন্ধ?
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। পার্কটি সপ্তাহে ছয় দিন খোলা রাখা হয় এবং প্রতি মঙ্গলবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও পার্ক খোলা থাকে এবং সেসময় বিশেষ আয়োজন করা হয়।
সাফারি পার্কের প্রবেশ মূল্য কত?
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে প্রবেশের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের ৫০ টাকা এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের ২০ টাকা টিকেট কাটতে হয়। স্টুডেন্ট আইডি কার্ড দেখিয়ে শিক্ষার্থীরা মাত্র ১০ টাকায় প্রবেশ করতে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য প্রবেশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। তবে পার্কের মূল আকর্ষণ কোর সাফারি দেখতে হলে আলাদা টিকেট কিনতে হবে যার মূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১৫০ টাকা এবং শিশুদের জন্য ৫০ টাকা।
কোর সাফারি কী?
কোর সাফারি হলো বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং প্রধান আকর্ষণ। এটি প্রায় ১২১৭ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত একটি বিশেষ এলাকা যেখানে বাঘ, সিংহ, হরিণ, ভাল্লুক, জিরাফ, জেব্রাসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী প্রাকৃতিক পরিবেশে খোলামেলাভাবে বিচরণ করে। এই এলাকায় দর্শনার্থীরা পায়ে হেঁটে প্রবেশ করতে পারে না, শুধুমাত্র পার্ক কর্তৃপক্ষের বিশেষ মিনিবাস বা জিপে করে একটি নির্দিষ্ট রুটে ঘুরে আসতে হয়।
সাফারি পার্কে কী কী প্রাণী দেখতে পাওয়া যায়?
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১৬৮ প্রজাতির বিভিন্ন বন্যপ্রাণী রয়েছে। পার্কের প্রধান আকর্ষণ হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার যার সংখ্যা আট টি, এবং সিংহ যার মধ্যে দুর্লভ সাদা সিংহও রয়েছে। এছাড়া রয়েছে কালো ভাল্লুক, আফ্রিকান চিতা, বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ যেমন চিত্রা হরিণ, সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ এবং প্যারা হরিণ। আফ্রিকান প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায় জেব্রা, জিরাফ, নীলগাই এবং ওয়াল্ডিবিস্ট। পাখি প্রেমীদের জন্য রয়েছে ম্যাকাও, পেলিকান, ফ্লেমিংগো, উটপাখি, মদনটাক এবং ধনেশসহ প্রায় ৩৪ প্রজাতির রঙিন পাখি। মেরিন অ্যাকুরিয়ামে দেখতে পাবেন টাইগার ফিশ, অস্কার, চিকলেট মাছসহ ২০ প্রজাতির বিরল মাছ। এছাড়াও রয়েছে প্রায় ২৬ প্রজাতির রঙিন প্রজাপতি, আলপাকা, ওয়ালাবি এবং ক্ষুদ্রকায় ঘোড়া।
পার্কে খাবারের কী ব্যবস্থা আছে?
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে খাবারের জন্য বেশ ভালো ব্যবস্থা রয়েছে তবে বাইরে থেকে কোনো খাবার নিয়ে প্রবেশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
সাফারি পার্কে কি রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে?
যদিও বেশিরভাগ দর্শনার্থী ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসেন কারণ সাফারি পার্ক ঢাকার খুব কাছে, তবুও যারা পার্কের ভিতরে রাত কাটাতে চান তাদের জন্য সীমিত সুবিধা রয়েছে। পার্কের বঙ্গবন্ধু স্কয়ারে একটি ইকো-রিসোর্ট এবং ডরমেটরি সুবিধা আছে তবে এর জন্য আগাম বুকিং দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া গাজীপুর শহরে এবং বাঘের বাজার এলাকায় বিভিন্ন মানের হোটেল ও রেস্টহাউস পাওয়া যায় যেখানে থাকার ব্যবস্থা করতে পারেন।
শিশুদের জন্য পার্কে কী কী সুবিধা রয়েছে?
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক শিশুদের জন্য একটি আদর্শ বিনোদন ও শিক্ষামূলক গন্তব্য। পার্কের ভিতরে একটি সম্পূর্ণ শিশু পার্ক রয়েছে যেখানে বিভিন্ন ধরনের রাইড যেমন সুইং, স্লাইড, ঘূর্ণায়মান চেয়ার এবং অন্যান্য খেলনা রয়েছে যার প্রতিটির জন্য ২০ থেকে ৫০ টাকা খরচ হয়। প্রজাপতি সাফারিতে শিশুরা রঙিন প্রজাপতিদের উড়তে দেখে মুগ্ধ হয় এবং তাদের সাথে ছবি তুলতে পারে। ম্যাকাও ল্যান্ডের রঙিন পাখি এবং মেরিন অ্যাকুরিয়ামের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিশুদের জন্য খুবই আকর্ষণীয়।
সাফারি পার্কে যাওয়ার সময় কী কী জিনিস সাথে নেওয়া উচিত?
সাফারি পার্কে যাওয়ার আগে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলে ভ্রমণ আরও আনন্দদায়ক হবে। সবার আগে আরামদায়ক পোশাক এবং হাঁটার উপযোগী জুতা পরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ পার্কে অনেক হাঁটতে হয়। সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি রাখুন এবং ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন অবশ্যই নিন কারণ ছবি তোলার অসংখ্য সুযোগ পাবেন। রোদ ও বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছাতা বা টুপি নিতে পারেন এবং সানগ্লাস রাখলে ভালো।
সাফারি পার্কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন?
বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। কোর সাফারিতে প্রবেশের সময় মিনিবাস বা জিপের সব জানালা ও দরজা নিরাপত্তার জন্য সঠিকভাবে বন্ধ করা হয় এবং গাইড সবসময় সাথে থাকেন। হিংস্র প্রাণীদের এলাকায় শক্তিশালী বেড়া এবং খাঁচা রয়েছে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
আশা করি এই গাইড আপনার বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ভ্রমণ পরিকল্পনায় সহায়ক হবে। সঠিক প্রস্তুতি নিয়ে, নিয়মকানুন মেনে এবং পরিবেশের প্রতি যত্নশীল হয়ে ভ্রমণ করুন। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করুন এবং আপনার পরিবার ও বন্ধুদের সাথে অবিস্মরণীয় স্মৃতি তৈরি করুন।
ফেসবুক: GoArif
