তুরস্কের ইস্তাম্বুলের উত্তরাঞ্চলীয় রিভা গ্রামে আরতুগ্রুল গাজী ও কুরুলুস উসমানের শুটিং লোকেশন বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো (Bozdağ Film Plateaus) অবস্থিত। এটি তুর্কি সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের এক জীবন্ত যাদুঘর হিসেবে পরিচিত। এই বিশাল চলচ্চিত্র সেটে নির্মিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত দুটি ঐতিহাসিক সিরিজ – ‘দিরিলিশ আরতুগ্রুল’ (Diriliş: Ertuğrul) এবং ‘কুরুলুস উসমান’ (Kuruluş: Osman)। সিরিজ দুটি শুধু তুরস্কেই নয়, বরং পাকিস্তান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে প্রায় ৭৫ কোটি দর্শকের হৃদয় জয় করেছে!

আরও: কেন ম্যাকঅ্যালেন আমেরিকার সবচেয়ে সস্তা শহর
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোর ইতিহাস
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো প্রতিষ্ঠা করেন মেহমেত বোজদাগ, যিনি আরতুগ্রুল এবং উসমান সিরিজের স্রষ্টা, প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার। ১৯৮৩ সালে তুরস্কের কায়সেরিতে জন্মগ্রহণকারী মেহমেত বোজদাগ সাকারিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৪ সালে, তুর্কি ঐতিহাসিক নাটকের জন্য একটি বিশাল এবং ঐতিহাসিকভাবে সঠিক পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে, বোজদাগ এবং তার দল রিভায় এই প্ল্যাটো শূন্য থেকে নির্মাণ করেন।
প্রথম মৌসুমের জন্য রিভায় ৪০,০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে প্ল্যাটো স্থাপন করা হয়, যেখানে ঐতিহাসিক নির্দেশনা অনুসারে ৩৫টি তাঁবু নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে এটি সম্প্রসারিত হয় এবং বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে, বোজদাগ ফিল্ম স্টুডিও ১৪০ একর জুড়ে বিস্তৃত, যা এটিকে ইউরোপের বৃহত্তম এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ফিল্ম সেট বানিয়েছে।
অবস্থান
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো ইস্তাম্বুলের বেইকোজ জেলার রিভা অঞ্চলে অবস্থিত। ইস্তাম্বুলের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৫-৪৫ কিলোমিটার দূরে, এটি পৌঁছাতে গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। তাকসিম স্কয়ার বা সুলতানাহমেত এলাকা থেকে সহজেই এই স্টুডিওতে পৌঁছানো যায়। প্ল্যাটোটি কৃষ্ণ সাগরের তীরে এবং বসফরাস প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত, যা একে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মধ্যযুগীয় আবহাওয়ার জন্য আদর্শ করে তুলেছে।
রিভা একটি ছোট গ্রাম, যার জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ২,৮৮৫ জন (২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী)। এই শান্ত ও সবুজ পরিবেশ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত, কারণ এখানে বনভূমি এবং প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ রয়েছে যা ত্রয়োদশ শতাব্দীর আনাতোলিয়ার পরিবেশ পুনর্নির্মাণের জন্য আদর্শ।
একটি যুগান্তকারী সিরিজ
‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ হলো একটি তুর্কি ঐতিহাসিক নাটক যা আরতুগ্রুল বে-এর জীবন অবলম্বনে নির্মিত। আরতুগ্রুল ছিলেন উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম ওসমানের পিতা। এই সিরিজটি মেহমেত বোজদাগ প্রযোজিত এবং মেতিন গুনায় পরিচালিত। এটি TRT 1 চ্যানেলে ১০ ডিসেম্বর ২০১৪ থেকে ২৯ মে ২০১৯ পর্যন্ত প্রচারিত হয় এবং মোট পাঁচটি সিজন সম্পন্ন হয়।
সিরিজটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর আনাতোলিয়ায় সেট করা হয়েছে, যেখানে আরতুগ্রুল তার কায়ি গোত্রের নেতৃত্ব দেন রাজনৈতিক সংঘাত, যুদ্ধ এবং পরিবর্তনশীল জোটের মধ্যে। এনগিন আলতান দুজাতান আরতুগ্রুল চরিত্রে অভিনয় করেন।
সেট নির্মাণ
প্রথম মৌসুমে বেইকোজ এবং রিভা অঞ্চলে দুটি প্ল্যাটো স্থাপন করা হয়। রিভায় ৪০,০০০ বর্গমিটার এলাকায় এবং বেইকোজ কুন্দুরা ফ্যাক্টরিতে ৬,০০০ বর্গমিটার বদ্ধ এলাকায় সেট তৈরি করা হয়। কুন্দুরা ফ্যাক্টরিতে আলেপ্পো, আলেপ্পো প্রাসাদ, সরবরাহ কক্ষ, অতিথি কক্ষ, করিডোর, অন্ধকূপ, কারা তয়গারের কক্ষ, সেলজুক প্যাভিলিয়ন, মন্দির হল এবং কক্ষ, লজ এবং তাঁবুর অভ্যন্তরীণ অংশ নির্মিত হয়।
রিভা প্ল্যাটোতে ৩৫টি তাঁবু মূল নকশা অনুসারে নির্মাণ করা হয়, যা কায়ি গোত্রের যাযাবর জীবনযাত্রা প্রতিফলিত করে। প্রযোজনা দলকে অসাধারণ মনোযোগ দিতে হয়েছিল প্রামাণিকতার দিকে। কাজাখস্তান থেকে বিশেষায়িত কোরিওগ্রাফারদের নিয়ে আসা হয়, যারা তিন মাস ধরে অশ্বারোহণ দক্ষতা, তলোয়ার লড়াই এবং তীরন্দাজি কৌশলের নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। পোশাক বিভাগ প্রায় ১,৮০০টি যুগোপযোগী পোশাক এবং হাজার হাজার সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করে।
প্রথম মৌসুম
সিরিজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে, বেশিরভাগ দৃশ্য রিভায় কেন্দ্রীভূত করা হয় লজিস্টিক কারণে এবং সেট নিয়ন্ত্রণের জন্য। প্রাথমিক মৌসুমগুলিতে কাপ্পাদোসিয়ার নেভশেহির এবং পশ্চিম আনাতোলিয়ার কিছু অংশেও দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সবকিছু রিভায় স্থানান্তরিত হয়।
পাইলট পর্বটি মুক্তির দিনে সবচেয়ে বেশি দেখা তুর্কি টেলিভিশন পর্ব ছিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান তার পরিবার নিয়ে একাধিকবার সেট পরিদর্শন করেন।
সাফল্য ও প্রভাব
‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ শুধু তুরস্কেই নয়, বিশ্বব্যাপী একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা হয়ে ওঠে। পাকিস্তানে এটি ‘আরতুগ্রুল গাজী’ নামে পরিচিত এবং বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সুপারিশের কারণে এবং আংশিকভাবে COVID-19 মহামারী লকডাউনের কারণে। PTV-এর ইউটিউব চ্যানেল ২০২০ সালের জুন মাসে ৫০ লক্ষেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার অর্জন করে। সিরিজটির উর্দু সংস্করণ মধ্য-মে পর্যন্ত ১৩ কোটিরও বেশি দর্শক অর্জন করে এবং সেপ্টেম্বরে এর সাবস্ক্রাইবার ১ কোটি ছাড়িয়ে যায়। বিশ্বব্যাপী সিরিজের ইউটিউব দর্শকদের ২৫ শতাংশ পাকিস্তান থেকে।
ভারতে, বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরের মুসলমানদের মধ্যে সিরিজটি বেশ জনপ্রিয়, যেখানে মানুষ এটিকে কাশ্মীর সংঘর্ষের অনুপ্রেরণা হিসাবে দেখে। একজন কাশ্মীরি জনসংযোগ পেশাদার বলেন, “প্রতিটি কাশ্মীরিকে এটি দেখা উচিত। ২,০০০ মানুষের একটি ছোট গোত্র বিজয়ী হয়। এটি অনুপ্রেরণামূলক।”
তবে, সিরিজটি কিছু বিতর্ক ছাড়া ছিল না। ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, মিসর, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ নিষিদ্ধ করা হয়। মিসরের দার আল-ইফতা আল-মিসরিয়া ঘোষণা করে যে সিরিজটি দেখা নিষিদ্ধ। কিছু সাংবাদিক সিরিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে মন্তব্য করেছেন, বলেছেন যে এটি সরকারের বার্তা প্রচারের একটি মাধ্যম।
নেটফ্লিক্স ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে সিরিজটি স্ট্রিম করে, “Resurrection: Ertugrul” শিরোনামে।
আরও: ইতিহাস ও আধুনিকতার আলোকছায়ায় বার্লিন
ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণ
‘কুরুলুস: উসমান’ হলো ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’-এর সরাসরি সিক্যুয়েল, যা ওসমান প্রথমের জীবন অবলম্বনে নির্মিত, যিনি উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং আরতুগ্রুলের পুত্র। সিরিজটি ATV চ্যানেলে ২০ নভেম্বর ২০১৯ থেকে প্রচারিত হয় এবং মেহমেত বোজদাগ কর্তৃক প্রযোজিত। মূল চরিত্রে অভিনয় করেন বুরাক ওজচিভিত, যিনি ওসমান বে চরিত্রে অভিনয় করেন।
সিরিজটি ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম দিকের ঘটনা চিত্রিত করে। এটি ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’-এর সমাপ্তির প্রায় এক দশক পরে শুরু হয় (যা প্রায় ১২৮০ সালে মোঙ্গল-বার্কে যুদ্ধের সাথে শেষ হয়েছিল) এবং দুর্বল সেলজুক সুলতানাত এবং বিভক্ত মোঙ্গল সাম্রাজ্যের শূন্যতায় ওসমানের উত্থান অনুসরণ করে।
শুটিং লোকেশন ও সেট ডিজাইন
‘কুরুলুস: উসমান’-এর প্রাথমিক শুটিং লোকেশন হলো বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো, যা রিভা অঞ্চলের বেইকোজ, ইস্তাম্বুলে অবস্থিত। এই বিশাল সেট ত্রয়োদশ শতাব্দীর জীবন পুনর্সৃষ্টি করে এবং এতে রয়েছে:
- কায়ি গোত্রের শিবির: ঐতিহ্যবাহী তাঁবু সহ
- ইনেগোল ক্যাসেল: মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান স্থাপত্য এবং বাইজেন্টাইন জীবনের সারমর্ম সহ
- সোগুত বাজার: যুগের দৃশ্যের জন্য পুনঃনির্মিত
- দুর্গ এবং সামরিক শিবির: যুদ্ধের দৃশ্যের জন্য
- প্রাসাদ ও প্রশাসনিক হল: রাষ্ট্র গঠনের প্রতিফলন
‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’-এর জন্য নির্মিত অনেক মূল কাঠামো পরবর্তীতে ‘কুরুলুস: ওসমান’-এর জন্য সম্প্রসারিত এবং অভিযোজিত হয়, যা দুই সিরিজের মধ্যে ধারাবাহিকতা প্রদান করে।
সেট ডিজাইনের পার্থক্য
‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ এবং ‘কুরুলুস: ওসমান’-এর সেট ডিজাইনে কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে:
- আরতুগ্রুল সেট: গোত্রীয় জীবনের উপর বেশি মনোনিবেশ করে, তাঁবু বসতি, বন যুদ্ধক্ষেত্র এবং মোঙ্গল আক্রমণের পটভূমি সমন্বিত। সেটগুলিতে একটি আরও যাযাবর এবং গ্রামীণ অনুভূতি ছিল কায়ি গোত্রের প্রাথমিক সংগ্রাম প্রতিফলিত করতে।
- ওসমান সেট: আরও উন্নত গ্রাম, প্রাসাদ এবং প্রশাসনিক হলের মতো স্থাপত্য উপাদান এবং আরও সংগঠিত পরিবেশ অন্তর্ভুক্ত করে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিনিধিত্ব করতে। গল্প এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে, প্রযোজনা ডিজাইন ওসমান বে-এর একটি গোত্রীয় নেতা থেকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতায় রূপান্তর প্রতিফলিত করে।
সাফল্য
‘কুরুলুস: উসমান’ তুরস্কে একটি রেকর্ড-ভাঙা হিট হয়েছে এবং তুরস্ক থেকে পাকিস্তান এবং তার বাইরে লক্ষ লক্ষ দর্শককে মুগ্ধ করেছে মহাকাব্যিক যুদ্ধ, রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর আনাতোলিয়ার সমৃদ্ধ চিত্রায়নের মাধ্যমে।
মেহমেত বোজদাগ দাবি করেন যে শোটি আলবেনিয়াতেও একটি বড় সাফল্য হয়েছে, যেখানে এটি ‘ওসমানি’ নামে পরিচিত, এবং বলেছেন যে এটি দেশে “সবচেয়ে বেশি দেখা টিভি শো”। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে, শোটি মধ্যপ্রাচ্যে নূর প্লে-তে সম্প্রচার শুরু হয়। পাকিস্তানে এটি জিও এন্টারটেইনমেন্ট এবং ভিডটাওয়ারে উর্দুতে প্রচারিত হয়। ৫৯তম পর্ব পাকিস্তানে দর্শক রেকর্ড ভেঙে দেয়।
সিরিজটি একটি বিশাল সাফল্য হওয়ার পরে, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি তার স্ত্রী সহ এর সেট পরিদর্শন করেন এবং প্রধান অভিনেতা বুরাক ওজচিভিত সহ এর কাস্টের সাথে দেখা করেন।
অন্যান্য প্রযোজনা
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোতে শুধু ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ এবং ‘কুরুলুস: ওসমান’ নয়, আরও অনেক উল্লেখযোগ্য তুর্কি ঐতিহাসিক নাটক নির্মিত হয়েছে:
- ইউনুস এমরে: আশকিন ইয়োলজুলুগু (Yunus Emre: Journey of Love) – ২০১৫
- মেহমেতচিক: কুত’উল-আমারে (Mehmetçik: Kut’ul-Amâre) – প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভিত্তিক
- বোজকিরিন আসলানি: জেলালেদ্দিন হারজেমশাহ (The Lion of the Steppe: Celaleddin Harzemşah)
- দেস্তান (Destan) – অষ্টম শতাব্দীতে সেট করা, যখন তুর্কিরা এশীয় স্তেপে বাস করত
- তুর্কলের গেলিয়ের: আদালেটিন কিলিজি (The Turks Are Coming: Sword of Justice) – চলচ্চিত্র
- আল সানজাক (Alsancak)
- আতেশ কুশলারি (Birds of Fire/Firebirds)
- ইবন-ই সিনা (Ibn-i Sînâ)
এই বৈচিত্র্যময় প্রযোজনাগুলি বোজদাগ ফিল্মকে তুরস্কের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পর্যটকদের বোজদাগ ফিল্ম
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো ২০২৩ সালের জুন মাস থেকে তাদের বিস্তৃত সেটগুলি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেছে। প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ সেট হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ এবং ‘কুরুলুস: ওসমান’-এর বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার কারণে এটি এখন একটি প্রধান পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শকরা এখানে আসেন তাদের প্রিয় সিরিজের সেট দেখতে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর তুর্কি সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা নিতে।
প্ল্যাটোটি সপ্তাহে সাতদিন, সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এটি শুধু তুরস্ক থেকে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা, বলকান এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকেও দর্শকদের স্বাগত জানায়, যা এটিকে একটি আন্তর্জাতিক মিলনকেন্দ্র বানিয়েছে।
ভ্রমণ ও টিকিট
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো পরিদর্শনের জন্য আগে থেকে বুকিং করা আবশ্যক। এটি সাধারণ দর্শকদের জন্য ওয়াক-ইন ভিজিট অনুমোদন করে না। টিকিট বিভিন্ন ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে কেনা যায়, এবং মূল্য নির্ভর করে ট্যুরের ধরনের উপর। স্ট্যান্ডার্ড এন্ট্রিতে সাধারণত প্রধান চিত্রগ্রহণ এলাকায় প্রবেশাধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকে, যখন প্রিমিয়াম ট্যুরে গাইডেড ন্যারেশন, পোশাকে ফটো সেশন এবং ঐতিহ্যবাহী পারফরম্যান্স অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
ইস্তাম্বুল থেকে দৈনিক ট্যুর পরিষেবা উপলব্ধ, যা সাধারণত তাকসিম স্কয়ার এবং সুলতানাহমেত থেকে শুরু হয়। ট্যুরে সাধারণত পরিবহন, লাঞ্চ, গাইডেড ট্যুর এবং কিছু কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকে। ট্যুর সাধারণত সোমবার, বুধবার, শুক্রবার এবং শনিবার উপলব্ধ।
দর্শনীয় স্থান সমূহ
দর্শকদের বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো ঘুরে দেখার জন্য বেশ কয়েকটি প্রধান এলাকা রয়েছে:
- কায়ি ওবাসি (কায়ি গোত্রের শিবির): এটি ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ এবং ‘কুরুলুস: উসমান’-এর একটি সেট। দর্শকরা এখানে ঐতিহ্যবাহী তাঁবু, গোত্রীয় জীবনযাত্রা এবং মধ্যযুগীয় আনাতোলিয়ার দৈনন্দিন কার্যক্রম দেখতে পারেন। এখানে অশ্বারোহণ, তীরন্দাজি, কুস্তি এবং ঘোড়ার শো-এর মতো কার্যক্রম উপভোগ করা যায়। দর্শকরা ঐতিহ্যবাহী তুর্কি পোশাক পরে স্মরণীয় ছবি তুলতে পারেন।
- ইনেগোল ক্যাসেল: এই দুর্গটি মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান স্থাপত্য এবং বাইজেন্টাইন জীবনের সারমর্ম ধারণ করে। ‘কুরুলুস: ওসমান’-এ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, যেখানে অনেক যুদ্ধ এবং বিজয়ের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। দর্শকরা দুর্গের প্রাচীর, টাওয়ার এবং অভ্যন্তরীণ কক্ষগুলি অন্বেষণ করতে পারেন।
- হারজেমশাহ প্রাসাদ: এই প্রাসাদটি ‘বোজকিরিন আসলানি: জেলালেদ্দিন হারজেমশাহ’ সিরিজের জন্য নির্মিত হয়েছিল। এটি সেলজুক এবং খাওয়ারিজমিয়ান স্থাপত্যের এক চমৎকার উদাহরণ, যেখানে জটিল কারুকাজ এবং ঐতিহাসিক নির্ভুলতা প্রতিফলিত।
- ইউর্গেঞ্চ বাজার: এই পুনর্নির্মিত বাজারটি মধ্যযুগীয় মধ্য এশীয় এবং আনাতোলিয়ান বাণিজ্য জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে। দর্শকরা এখানে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প তৈরি দেখতে পারেন এবং কিছু স্মৃতিচিহ্ন কিনতে পারেন।
- ইয়েনিশেহির (বুরসা অঞ্চল): ‘কুরুলুস: উসমান’-এ দেখানো বুরসা অঞ্চল, যেখানে ওসমান বে-এর প্রাসাদ এবং উসমানীয় অভিযান ও বিজয়ের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।
- সোগুত এলাকা: এটি একটি শান্ত কোণ যেখানে দর্শকরা ঐতিহ্যবাহী শরবত বা কফি উপভোগ করতে পারেন এবং স্মৃতিচিহ্ন কিনতে পারেন। এখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়ার সুবিধা রয়েছে।
অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রম
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো শুধুমাত্র একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতামূলক পর্যটন কেন্দ্র। দর্শকরা এখানে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন:
- তীরন্দাজি: দর্শকরা ঐতিহাসিক তীর ধনুক ব্যবহার করে তীরন্দাজি অনুশীলন করতে পারেন, ঠিক যেমন সিরিজের বীর যোদ্ধারা করতেন।
- কামার কাজ: ঐতিহ্যবাহী কামার কাজ দেখা এবং কিছু ক্ষেত্রে চেষ্টা করার সুযোগ।
- হস্তশিল্প প্রদর্শনী: তাঁত বুনন, কাপড় তৈরি এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী তুর্কি হস্তশিল্প দেখা।
- ঐতিহাসিক পোশাক পরা: দর্শকরা ঐতিহাসিক তুর্কি পোশাক পরে ফটোগ্রাফি করতে পারেন।
- অশ্বারোহণ: বিশেষজ্ঞ অশ্বারোহীদের নেতৃত্বে ঘোড়ায় চড়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
- প্রিমিয়াম পোশাক ফটোগ্রাফি: বিশেষ পোশাকে পেশাদার ফটো সেশন।
- ব্যক্তিগত গাইডেড ট্যুর: আরও বিস্তারিত এবং ব্যক্তিগতকৃত অভিজ্ঞতার জন্য।
লাইভ পারফরম্যান্স ও শো
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর লাইভ পারফরম্যান্স, বিশেষত “এপিক অফ হর্সেস” (Epic of Horses) নামক অশ্বারোহণ শো। জানবি জেলান, বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোর জেনারেল আর্ট ডিরেক্টর এবং কোরিওগ্রাফার, এই শোটি তুরস্কে প্রথম এবং একমাত্র এই ধরনের পারফরম্যান্স বলে উল্লেখ করেছেন।
এই শোতে ৪০ জন অশ্বারোহী এবং মোট ৯টি ঘোড়া রয়েছে। এটি একটি ৪০ মিনিটের পারফরম্যান্স যা ঘোড়া এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্ক এবং যুদ্ধের মহাকাব্যিক কাহিনী বর্ণনা করে। এই শোয়ের জন্য একটি বিশেষ শো সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে যার ধারণক্ষমতা ৬০০ জন এবং এতে তাঁবু স্থাপত্য ব্যবহার করা হয়েছে।
এছাড়াও, শিশুদের জন্য বিশেষ থিয়েটার পারফরম্যান্স রয়েছে (শুধুমাত্র তুর্কি ভাষায়), যা ইতিহাসকে শিক্ষামূলক এবং বিনোদনমূলক উপায়ে উপস্থাপন করে।
আরও: সময়ের আলপনায় আঁকা শহর কিয়োটো
সোগুত ১২৯৯ রেস্তোরাঁ
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোতে দর্শকদের জন্য একটি অনন্য খাদ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে “সোগুত ১২৯৯ রেস্তোরাঁ”-এ। এই রেস্তোরাঁর ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ডিরেক্টর হলেন জাতীয় শেফ হুসেইন বোলুক, যিনি “লিভিং কিচেন” ধারণা প্রবর্তন করেছেন।
এই রেস্তোরাঁতে সেলজুক, উসমানীয় এবং প্রাচীন আনাতোলিয়ান রন্ধনশৈলীর স্বাদ একসাথে পরিবেশন করা হয়। প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী খাবার তার ইতিহাস সহ পরিবেশন করা হয়, যা দর্শকদের জন্য একটি অসাধারণ ডাইনিং অভিজ্ঞতা প্রদান করে। শেফ বোলুক বলেন, “মধ্য এশিয়া থেকে আনাতোলিয়ার দরজায় আসার আগে, আমরা দই এবং ভেড়ার মাংস খেতাম।” এই রেস্তোরাঁ তুর্কি রন্ধনশৈলীর ইতিহাসকে স্থানীয় এবং বিদেশী অতিথিদের কাছে উপস্থাপন করে।
রেস্তোরাঁতে ঐতিহ্যবাহী শরবত, হস্তনির্মিত পানীয় এবং উসমানীয় যুগের খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়।
ফিল্ম স্টুডিও মিউজিয়াম
প্ল্যাটোতে একটি মিউজিয়ামও রয়েছে যেখানে দর্শকরা বোজদাগ ফিল্মের ইতিহাস, স্ক্রিপ্ট এবং পোশাক কাছ থেকে দেখতে পারেন। এখানে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত টিভি সিরিজ তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। মিউজিয়ামে প্রদর্শিত রয়েছে:
- মূল পোশাক এবং অস্ত্র
- সিরিজের স্ক্রিপ্ট এবং স্টোরিবোর্ড
- প্রযোজনার ছবি এবং ভিডিও
- বিভিন্ন সিরিজের প্রপস এবং সেট ডিজাইন উপাদান
প্রযোজনা প্রক্রিয়া
বোজদাগ ফিল্মের সিরিজগুলি ঐতিহাসিক নির্ভুলতার জন্য বিখ্যাত। প্রযোজনা দল ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে প্রতিটি বিবরণ নিশ্চিত করে। পোশাক, অস্ত্র, স্থাপত্য এবং এমনকি দৈনন্দিন জীবনের সরঞ্জাম সবকিছু ঐতিহাসিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
প্রশিক্ষণ ও কোরিওগ্রাফি
অভিনেতাদের জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম রয়েছে। কাজাখস্তান থেকে বিশেষায়িত কোরিওগ্রাফারদের নিয়ে আসা হয়, যারা তিন মাস ধরে:
- অশ্বারোহণ দক্ষতা
- তলোয়ার লড়াই
- তীরন্দাজি কৌশল
- ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধ কৌশল
শেখান। এই প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করে যে যুদ্ধের দৃশ্যগুলি বাস্তবসম্মত এবং ঐতিহাসিকভাবে নির্ভুল।
পোশাক
পোশাক বিভাগ একটি বিশাল কাজ করেছে। শুধু ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’-এর জন্যই প্রায় ১,৮০০টি যুগোপযোগী পোশাক এবং হাজার হাজার সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি পোশাক ঐতিহাসিক নথি এবং মধ্যযুগীয় বস্ত্রের গবেষণার উপর ভিত্তি করে ডিজাইন করা হয়েছে।
সেট নির্মাণ
সেট নির্মাণে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। স্থপতি এবং ডিজাইনাররা মধ্যযুগীয় আনাতোলিয়ান, সেলজুক এবং প্রাথমিক উসমানীয় স্থাপত্যের গবেষণা করে কাঠামো তৈরি করেছেন। কাঠ, পাথর এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে প্রামাণিকতা বজায় রাখতে।
সাংস্কৃতিক প্রভাব ও ইসলামিক ঐতিহ্য
আরতুগ্রুল এবং উসমান শুধু বিনোদনমূলক সিরিজ নয়, এগুলি ইসলামিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সাহস এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা প্রচার করে। সিরিজগুলি দেখায় কীভাবে আরতুগ্রুল এবং ওসমান অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এই সিরিজগুলি তুর্কি এবং ইসলামিক সংস্কৃতির প্রতি নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিশ্বজুড়ে মুসলিম দর্শকরা এই সিরিজের মাধ্যমে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস এবং ইসলামিক সভ্যতার অবদান সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।
বিশেষ করে যুব প্রজন্মের মধ্যে, এই সিরিজগুলি ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধ সম্পর্কে আগ্রহ জাগিয়েছে। অনেক যুবক এবং যুবতী তীরন্দাজি, ঘোড়া চালনা এবং ঐতিহাসিক অধ্যয়নে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
পর্যটন শিল্পে অবদান
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো তুরস্কের পর্যটন শিল্পে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঐতিহ্যগত পর্যটন আকর্ষণ যেমন আয়া সোফিয়া, টপকাপি প্রাসাদ এবং ক্যাপাডোসিয়ার পাশাপাশি, বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে যা চলচ্চিত্র এবং ইতিহাসকে একসাথে নিয়ে আসে।
প্ল্যাটোতে প্রতিদিন শত শত আন্তর্জাতিক পর্যটক আসেন। পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং এমনকি ইউরোপ ও আমেরিকা থেকেও দর্শকরা আসেন। এটি তুরস্কের সফট পাওয়ার এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
রিভা অঞ্চলের স্থানীয় অর্থনীতিতেও বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। প্ল্যাটো শত শত স্থানীয় মানুষকে কর্মসংস্থান দিয়েছে এবং আশেপাশের রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং পরিবহন ব্যবসায়ীদের জন্য আয়ের উৎস সৃষ্টি করেছে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ অসংখ্য পুরস্কার এবং স্বীকৃতি অর্জন করেছে। প্রধান অভিনেতা এনগিন আলতান দুজাতান মোট ২৫টি পুরস্কার জিতেছেন, যার মধ্যে ৫টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তিনি ২০১৯ সালে দুবাইতে অনুষ্ঠিত Distinctive International Arab Festivals Awards (DIAFA)-তে “সেরা আন্তর্জাতিক অভিনেতা” পুরস্কার পান। ২০২১ সালে তিনি Indian Television Academy (ITA) থেকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পান।
সিরিজটি তুরস্কে Golden Butterfly Award, Golden Palm Award, এবং Turkey Youth Award সহ অসংখ্য পুরস্কার জিতেছে। ২০১৬ সালে, সিরিজটি “সেরা টিভি সিরিজ” বিভাগে Golden Butterfly Award জিতেছিল।
বিশ্ব রেকর্ড দাবি
২০২০ সালে, বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয় যে ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে “ইতিহাসের সেরা নাটকীয় কাজ” হিসাবে স্থান পেয়েছে। দাবি করা হয়েছিল যে সিরিজটি বিশ্বব্যাপী ৩ বিলিয়ন ভিউ অর্জন করেছে এবং ৩৯টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তবে, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে এই দাবির কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। যদিও এই দাবি সত্য নাও হতে পারে, সিরিজটির বিশাল সাফল্য এবং বৈশ্বিক প্রভাব অনস্বীকার্য।
সিরিজটির উর্দু সংস্করণ শুধুমাত্র YouTube-এ ২৪০ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ পেয়েছে। PTV-এর YouTube চ্যানেল একটি মাসে সবচেয়ে বেশি নতুন সাবস্ক্রাইবারের রেকর্ড ভেঙেছে এবং প্ল্যাটফর্মে শীর্ষ ৫০টি সর্বাধিক দেখা চ্যানেলের মধ্যে স্থান পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’-এর অভিনেতারা পাকিস্তান স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডসে “গ্লোবাল ইনফ্লুয়েন্স অ্যাওয়ার্ড” পেয়েছেন। জেলাল আল এবং এমরে উচতেপে এই সম্মান অর্জন করেন। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি এবং প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান উভয়েই সিরিজের সেট পরিদর্শন করেছেন এবং এর সাফল্যের প্রশংসা করেছেন।
দর্শক অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনা
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো পরিদর্শনকারী দর্শকরা তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পর্যটকরা উল্লেখ করেছেন যে এটি একটি “জীবনকালের অভিজ্ঞতা” এবং “ইতিহাসের মধ্যে পদচারণা”-এর মতো অনুভূতি দেয়। পাকিস্তানি দর্শকরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে তারা তাদের প্রিয় চরিত্রদের সেটে দাঁড়িয়ে একটি আবেগময় সংযোগ অনুভব করেছেন। অনেকে বলেছেন যে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা এবং ঘোড়ায় চড়া তাদের জন্য একটি স্বপ্ন পূরণের মতো ছিল।
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি জনপ্রিয় চেক-ইন স্থান হয়ে উঠেছে। Instagram, Facebook, এবং TikTok-এ হাজার হাজার পোস্ট এবং ভিডিও শেয়ার করা হয় প্রতিদিন। #BozdagFilmPlateau, #ErtugrulSet, এবং #KurulusOsman হ্যাশট্যাগগুলি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অনেক ইনফ্লুয়েন্সার এবং ভ্লগার এখানে আসেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যা প্ল্যাটোর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি করেছে।
আরতুগ্রুল ও কুরুলুস ওসমান নিয়ে অজানা তথ্য
আরতুগ্রুল সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য অত্যন্ত সীমিত। প্রধান অভিনেতা এনগিন আলতান দুজাতান জানিয়েছেন যে আরতুগ্রুলের জীবন সম্পর্কে মৌলিক ঐতিহাসিক নথি মাত্র ৭ পাতার! এই সীমিত তথ্যের উৎসগুলি হলো তুর্কি আর্কাইভ, ইবনে আরাবির ইতিহাস, টেম্পলারদের সম্পর্কিত পশ্চিমা আর্কাইভ, বাইজেন্টাইন সময়রেখা এবং কিংবদন্তিগুলি। লেখক ও প্রযোজকদের এই ৭ পাতার তথ্য থেকে পাঁচটি সিজন এবং ১৫০টি পর্ব তৈরি করতে বিস্তর গবেষণা করতে হয়েছে।
এই স্বল্প তথ্যের কারণে, প্রযোজকরা ‘দেদে কোরকুত’ বই, ‘দেভলেত আনা’ এবং ‘ওসমানচিক’-এর মতো ঐতিহাসিক উৎস এবং মৌখিক ঐতিহ্যগুলি গবেষণা করেছেন। এনগিন আলতান নিজে এই বইগুলি পড়েছেন চরিত্রের সারমর্ম বুঝতে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর জীবনযাত্রার অনুভূতি পেতে।
সিরিজে আরতুগ্রুল নিজেকে “সুলেমান শাহের পুত্র আরতুগ্রুল” হিসেবে পরিচয় দেন। তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, তার পিতার প্রকৃত নাম ছিল ‘গুন্দুজ আলপ’, সুলেমান শাহ নয়। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে প্রথম ওসমানের সময়কালের দুটি মুদ্রায়, যেখানে লেখা রয়েছে: “ওসমান বিন আরতুগ্রুল বিন গুন্দুজ আলপ” অর্থাৎ “ওসমান, আরতুগ্রুলের পুত্র, গুন্দুজ আলপের পৌত্র”। এই আবিষ্কারটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক এবং সিরিজ নির্মাণের সময় ঐতিহ্যবাহী তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এটি ইতিহাসের রহস্যময়তার একটি উদাহরণ।
আরও: স্বপ্নে আঁকা শহর কেপ টাউন
সিরিজে ইবনে আরাবিকে আরতুগ্রুলের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার দোয়ায় আরতুগ্রুল বহুবার শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা পান। যদিও ইবনে আরাবি আরতুগ্রুলের সমসাময়িক ছিলেন এবং আনাতোলিয়া সফর করেছিলেন (১২০৫ সালে মালাত্যা এবং কোন্যা, এবং ১২১০ সালে কায়সেরি, মালাত্যা, সিভাস এবং হাররান পরিদর্শন করেন), তবে তাদের দুজনের সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা তার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ইবনে আরাবি ১২৪০ সালে দামেস্কে মৃত্যুবরণ করেন। সুলতান আলাউদ্দিন প্রথম সেলজুক সুলতান ছিলেন ১২২০-১২৩৭ সাল পর্যন্ত।
সিরিজে দেখানো হয় যে সুলতান আলাউদ্দিনকে কুখ্যাত সাদ আল-দিন কোপেক হত্যা করে। তবে ঐতিহাসিকভাবে, ১২৩৭ সালে একটি বিলাসবহুল ভোজের পরে সুলতান আলাউদ্দিন বিষক্রিয়ায় মারা যান। তার মৃত্যু আকস্মিক ছিল কিন্তু কে তাকে বিষ প্রয়োগ করেছিল তার বিস্তারিত অজানা। সেই সময়ের গুজব ছিল যে তার পুত্র গিয়াসউদ্দিন কায়খুসরাউ দ্বিতীয় তাকে বিষ প্রয়োগ করেছিল, যিনি পরে সিংহাসনে আরোহণ করেন, যদিও তার পিতা চেয়েছিলেন তার ছোট ভাই ইজ আল-দিন কিলিজ আরসলান তৃতীয় পরবর্তী রাজা হন।
তবে সাদ আল-দিন কোপেক সত্যিই একজন বিশ্বাসঘাতক এবং ক্ষমতালোভী ব্যক্তি ছিলেন। সেলজুক এবং আইয়ুবি ইতিহাসবিদদের বিবরণ অনুসারে, সিরিজে তাকে অত্যন্ত সঠিকভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। কোপেক সুলতান কায়খুসরাউয়ের দুই সৎভাইকে তাদের মা গাজিয়া খাতুনসহ শ্বাসরোধে হত্যা করেছিল।
সিরিজে যে ক্যারাভানসেরাই (রাস্তার পাশের সরাই) দেখানো হয় যেখানে সব যুদ্ধ এবং গোপন বৈঠক হয়, সেটি আসলে সাদ আল-দিন কোপেক ১২৩৫-১২৩৬ সালে নির্মাণ করেছিলেন! এটি কোন্যা থেকে আকসারায়ের রাস্তায় ১৬ মাইল দূরে অবস্থিত। এই ক্যারাভানসেরাই আজও টিকে আছে এবং এতে দুটি শিলালিপি রয়েছে: একটিতে কোপেককে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নাম উল্লেখ করা হয়েছে, এবং অন্যটিতে সুলতান আলা আল-দিন কায়কুবাদ এবং তার উত্তরসূরি সুলতান কায়খুসরাউ উভয়ের পৃষ্ঠপোষকতার ইঙ্গিত রয়েছে।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, হালিমে সুলতান ৬৭ বছর বয়সে ওসমানকে জন্ম দিয়েছিলেন, যা একটি অলৌকিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত! তবে সিরিজে তাকে অনেক আগেই ওসমানের জন্ম দিতে দেখানো হয়েছে, যা আরও বাস্তবসম্মত। এই তথ্যটি সিরিজ নির্মাতারা নাটকীয়তার জন্য পরিবর্তন করেছেন।
দুন্দার বে, আরতুগ্রুলের সবচেয়ে ছোট ভাই, যিনি সিজন ১ এবং ২-তে একটি ছোট ছেলে ছিলেন এবং সিজন ৩ এবং ৪-তে একজন পূর্ণবয়স্ক বে ছিলেন, তাকে তার ভাতিজা সুলতান ওসমান (আরতুগ্রুলের পুত্র এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা) হত্যা করেছিলেন। এই ট্র্যাজিক পরিণতি ‘কুরুলুস: ওসমান’ সিরিজে দেখানো হয়েছে।
প্রধান অভিনেতা এনগিন আলতান দুজাতান তিন মাস ধরে ঘোড়া চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং কখনো ভাবেননি যে তিনি ঘোড়ায় চড়ে তীর ছুঁড়তে পারবেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, তিনি এই দক্ষতা শিখেছেন এবং অসাধারণভাবে করেছেন। কাজাখস্তান থেকে বিশেষ প্রশিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল অশ্বারোহণ, তলোয়ার লড়াই এবং তীরন্দাজি শেখানোর জন্য।
এনগিন শুধু শারীরিকভাবেই নয়, বরং আরতুগ্রুলের চরিত্রটি মানসিক এবং আবেগিকভাবে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি অনেক সময় কাটিয়েছেন যেসব অভিনেতারা সিরিজে আরতুগ্রুলের পরামর্শদাতাদের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তাদের সাথে, যাতে ক্যামেরায় তাদের সম্পর্ক এবং রসায়ন স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়।
সেটে ২৫টি ঘোড়া ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এই ঘোড়াগুলির যত্ন নেওয়ার জন্য একজন পশু চিকিৎসক নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রামাণিকতার চাহিদা পূরণের জন্য তুর্কি শিল্প এটি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। একটি ছোট চিড়িয়াখানার মতো বিশেষ এলাকাও তৈরি করা হয়েছিল সিরিজে প্রদর্শিত সব প্রাণীদের জন্য, যার মধ্যে ছিল ছাগল, ভেড়া, বুলবুলি, তিতির ইত্যাদি।
সিরিজের কোরিওগ্রাফি করেছে ‘নোমাড’ নামক একটি কোম্পানি, যারা ‘দ্য এক্সপেন্ডেবলস ২’, ‘৪৭ রোনিন’ এবং ‘কোনান দ্য বারবারিয়ান’-এর মতো হলিউড চলচ্চিত্রেও কোরিওগ্রাফি করেছে। অভিনেতা, ঘোড়া এবং অন্যান্য দৃশ্যের জন্য বিশেষ কোরিওগ্রাফ তৈরি করা হয়েছিল।
তুরস্কের জাতীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্কের একটি প্রকল্প হওয়ায়, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান নিজে তার স্ত্রী এবং কন্যা নিয়ে ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’-এর সেট পরিদর্শন করেছেন। তিনি সমস্ত অভিনেতাদের ব্যক্তিগতভাবে অভিবাদন জানিয়েছেন এবং শুটিং তত্ত্বাবধান করেছেন। একইভাবে, ‘কুরুলুস: ওসমান’-এর বিশাল সাফল্যের পরে, পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি তার স্ত্রী সহ সেট পরিদর্শন করেন এবং প্রধান অভিনেতা বুরাক ওজচিভিতসহ কাস্টের সাথে দেখা করেন।
সিজন ২-এ ‘নোয়ান’ চরিত্রটি ‘বাইজু নোয়ান’ নামক একজন ব্যক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি, যিনি একজন মোঙ্গল কমান্ডার ছিলেন যাকে ওগেদেই খান (চেঙ্গিস খানের তৃতীয় পুত্র) মোঙ্গল সাম্রাজ্যকে পশ্চিমে সেলজুক সালতানাতের দিকে সম্প্রসারিত করার জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন। তবে সম্ভবত আরতুগ্রুল তাকে হত্যা করেননি, বা কায়ি গোত্রের সাথে এত তীব্র এবং ব্যক্তিগত সংঘর্ষ ঘটেনি।
নোয়ান এবং তার সৈন্যরা বনে পিছু হটে এবং তুর্কি গোত্রগুলিতে বিক্ষিপ্ত আক্রমণ চালায় কারণ সেই সময়কালে (ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি) মোঙ্গল সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি বড় বিভাজন তৈরি হচ্ছিল এবং ওগেদেই খানের মৃত্যুর পরে নেতৃত্বের জন্য একটি দৌড় শুরু হয়েছিল, তাই আনাতোলিয়ায় মোঙ্গল শক্তিবৃদ্ধির ঘাটতি ছিল।
সিরিজটি ১০ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে প্রথম প্রচারিত হলে ৫.৫৩ রেটিং পায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুর্কি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে। সিরিজটি যে সেরা রেটিং অর্জন করেছিল তা ছিল ১৭.০০, যা ছিল পর্ব ১০২-এর জন্য! পাইলট পর্বটি মুক্তির দিনে সবচেয়ে বেশি দেখা তুর্কি টেলিভিশন পর্ব ছিল।
‘কুরুলুস: ওসমান’-এ শেখ এদেবালি একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যিনি ওসমানের আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতা এবং শ্বশুর (বালা হাতুনের পিতা)। ঐতিহ্য অনুসারে, এদেবালি প্রায় ১২০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন! তিনি ১৩২৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন, ঠিক উসমানীয়রা বুরসা দখল করার আগে। সিরিজ এই তথ্যগুলি সম্মান করে, যদিও সঠিক মিথস্ক্রিয়াগুলি নাটকীয় করা হয়েছে।
ওসমানের বিখ্যাত স্বপ্ন – যেখানে একটি গাছ তার নাভি থেকে বৃদ্ধি পায় এবং পুরো পৃথিবী ঢেকে যায় – এটি একটি বিখ্যাত কিংবদন্তি। শেখ এদেবালি এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেন যে ওসমান একটি মহান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হবে। এই দৃশ্যটি ‘কুরুলুস: ওসমান’-এ আবেগঘন ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং এটি লোককাহিনীতে প্রোথিত।
বামসি বেয়রেক একজন কিংবদন্তি বীর ছিলেন যার জীবন বর্ণিত হয়েছে ওঘুজ তুর্কিদের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প “দেদে কোরকুতের বই”-তে, যা বিখ্যাত ওঘুজ তুর্কি লোক বর্ণনাকারী দেদে কোরকুত লিখেছেন। সিরিজে বামসি একটি প্রিয় চরিত্র, এবং তার কিংবদন্তি এবং সিরিজের চিত্রায়নের মিশ্রণ দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
আবদুর রহমান গাজি ওসমান এবং ওরহান প্রথমের অনেক বিজয় এবং জয়ে অবিচ্ছেদ্য ছিলেন এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রাথমিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিলেন। তার সবচেয়ে বিখ্যাত বিজয় হল সুলতানবেইলিতে আয়দোস ক্যাসেল জয়। আক্চা কোচা এবং কোনুর আলপের (উভয়ই আরতুগ্রুল গাজি তুর্বেসিতে কবর আছে) সাথে, সুলতান ওরহান গাজি তাকে আয়দোস ক্যাসেল জয় করার আদেশ দিয়েছিলেন। ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ এবং পরবর্তীতে ‘কুরুলুস: ওসমান’-এ আবদুর রহমান আলপ/গাজির চরিত্র একই অভিনেতা দ্বারা উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রধান অভিনেতা এনগিন আলতান দুজাতান স্বীকার করেছেন যে যদিও তিনি স্ক্রিপ্ট খুব পছন্দ করেছিলেন, তবুও একজন অভিনেতা হিসেবে তার নিজের সন্দেহ ছিল। এনগিন শেয়ার করেছেন যে তিনি সত্যিই সিরিজের সারমর্ম অনুভব করতে চেয়েছিলেন অন্যথায় ঐতিহাসিক যাত্রা পর্দায় যেমন হওয়া উচিত তেমন চিত্রিত করা যেত না। পরিচালক এবং প্রযোজক তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে এই সিরিজের প্রতিটি চরিত্র সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার এবং বিশ্বাসের সাথে চিত্রিত হবে এবং বাকিটা ইতিহ# আরতুগ্রুল ও কুরুলুস ওসমানের শুটিং লোকেশন: তুরস্কের বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো
ভ্রমণের সেরা সময়
বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো সারা বছর খোলা থাকে, তবে সেরা সময় হলো বসন্ত (এপ্রিল-মে) এবং শরৎ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)। এই সময়ে আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং আউটডোর কার্যক্রম উপভোগ করার জন্য আদর্শ। গ্রীষ্মকালে (জুন-আগস্ট) অনেক বেশি গরম হতে পারে এবং শীতকালে (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি) বেশ ঠান্ডা। রমজান মাসে বিশেষ কার্যক্রম এবং থিম ডে আয়োজন করা হয়, যা মুসলিম দর্শকদের জন্য একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
- আরামদায়ক হাঁটার জুতা (প্ল্যাটো বিশাল এবং অনেক হাঁটতে হয়)
- সানস্ক্রিন এবং টুপি (বাইরের কার্যক্রমের জন্য)
- ক্যামেরা বা স্মার্টফোন (ছবি তোলার জন্য)
- পানির বোতল
- কিছু নগদ টাকা (স্মৃতিচিহ্ন এবং অতিরিক্ত কার্যক্রমের জন্য)
কীভাবে যাবেন
ইস্তাম্বুল থেকে যাওয়ার জন্য টুরিস্ট বাস সবচেয়ে সুবিধাজনক। তাকসিম বা সুলতানাহমেত থেকে দৈনিক ট্যুর বাস পাওয়া যায়।ব্যক্তিগত গাড়ি/ট্যাক্সি তে যেতে প্রায় ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লাগে।
বুকিং এবং টিকিট
আপনি অনলাইনে আগে থেকেই টিকিট বুকিং করে নিতে পারবেন। এছাড়া বিভিন্ন ট্যুর অপারেটর এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট পাওয়া যায়। গ্রুপ বুকিংয়ের ক্ষেত্রে কিছু ডিস্কাউন্ট পেতে পারেন। আর শিশু এবং সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য বিশেষ ছাড় রয়েছে। অনলাইন থেকে আগেই টিকিট বুক করতে পারেন: www.bozdagfilmplatolari.com ।
পুরো বোজদাগ ফিল্ম স্টুডিও ঘুরে দেখার জন্য কমপক্ষে ৪-৫ ঘণ্টা লাগবে। যদি সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে চান এবং দুপুরের খাবার খেতে চান, তবে পুরো দিনের (৬-৮ ঘণ্টা) সময় হাতে রাখা ভালো।
কোথায় খাবেন
প্ল্যাটোতে “সোগুত ১২৯৯ রেস্তোরাঁ” রয়েছে যেখানে ঐতিহ্যবাহী তুর্কি খাবার পাওয়া যায়। অনেক ট্যুর প্যাকেজে লাঞ্চ/দুপুরের খাবার অন্তর্ভুক্ত থাকে। এখানে হালাল খাবার পাবেন।
স্থানীয় গাইড
এখানের স্টাফরা সাধারণত তুর্কি এবং ইংরেজি বলতে পারেন। কিছু গাইড আরবি এবং উর্দু জানেন। বাংলাদেশি দর্শকদের জন্য ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারেন।
বিভিন্ন তুর্কি এবং আন্তর্জাতিক ট্যুর অপারেটর বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটো ট্যুর অফার করে। GetYourGuide, Viator এবং TripAdvisor-এ অনেক বিকল্প পাওয়া যায়। বুকিংয়ের আগে রিভিউ পড়ে নিন।
অন্যান্য সেটের সাথে তুলনা
হলিউড স্টুডিও: বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোকে হলিউডের Warner Bros. Studios বা Universal Studios-এর সাথে তুলনা করা যায়, তবে এটি বিশেষভাবে ঐতিহাসিক নাটকের জন্য নিবেদিত। প্ল্যাটোর প্রামাণিকতা এবং ঐতিহাসিক নির্ভুলতা এটিকে আলাদা করে।
রোমের সিনেসিট্টা স্টুডিও: ইতালির সিনেসিট্টা স্টুডিওর মতো, বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোও মহাকাব্যিক ঐতিহাসিক প্রযোজনার জন্য পরিচিত। তবে বোজদাগ বিশেষভাবে তুর্কি-ইসলামিক ইতিহাসে ফোকাস করে।
নিউজিল্যান্ডের হবিটন: ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’-এর হবিটন সেটের মতো, বোজদাগ ফিল্ম প্ল্যাটোও একটি জনপ্রিয় সিরিজের সেট থেকে একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তবে বোজদাগ বাস্তব ইতিহাস ভিত্তিক, যা এটিকে আরও শিক্ষামূলক করে তোলে।
বিতর্ক ও সমালোচনা
কিছু সমালোচক মন্তব্য করেছেন যে ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ এবং ‘কুরুলুস: ওসমান’ সরকারি বার্তা প্রচারের একটি মাধ্যম। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগানের সাথে সিরিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং তার একাধিকবার সেট পরিদর্শন এই অভিযোগকে শক্তিশালী করেছে। প্রফেসর বুরাক ওজচেটিন বলেছেন, “তারা, একভাবে, বর্তমান তুর্কি জনসাধারণের জন্য উসমানীয় ইতিহাস পুনর্লিখন করছে।”
২০২০ সালে, মিসর, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘দিরিলিশ: আরতুগ্রুল’ নিষিদ্ধ করা হয়। মিসরের দার আল-ইফতা আল-মিসরিয়া ঘোষণা করে যে সিরিজটি দেখা নিষিদ্ধ। এটি মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্কের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা হয়।
কিছু ইতিহাসবিদ প্রশ্ন করেছেন সিরিজের ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিয়ে, বিশেষত যেহেতু আরতুগ্রুলের জীবন সম্পর্কে খুব কম নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য উপলব্ধ। তবে, প্রযোজকরা বলেছেন যে সিরিজটি ঐতিহাসিক কল্পকাহিনী এবং শিল্পিক স্বাধীনতা নিয়েছে।
প্রয়োজনীয় তথ্য
- ঠিকানা: Riva, Beykoz, Istanbul, Turkey
- খোলার সময়: প্রতিদিন ১০:০০ – ২০:০০
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইট: www.bozdagfilm.com.tr (তথ্যের জন্য চেক করুন)
- টিকিট বুকিং: www.bozdagfilmplatolari.com
ভিসা তথ্য
বাংলাদেশি নাগরিকরা তুরস্ক ভ্রমণের জন্য ই-ভিসা পেতে পারেন, যা অনলাইনে আবেদন করা যায়। ইস্তাম্বুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ভালোভাবে সংযুক্ত এবং ঢাকা থেকে সরাসরি এবং সংযোগকারী ফ্লাইট পাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন
রিভা অঞ্চলে থাকার জন্য সীমিত আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে, তাই বেশিরভাগ দর্শক ইস্তাম্বুলে থাকেন এবং দিনে/ডে ট্যুর করেন। তাকসিম, সুলতানাহমেত বা বেশিক্তাস অঞ্চলে থাকার সুপারিশ করা হয়, যেখান থেকে পরিবহন সুবিধাজনক।
টিপস ও সতর্কতা
- সাধারণ ফটোগ্রাফি এবং ভিডিওগ্রাফি অনুমোদিত। তবে, যদি শুটিং চলছে, তবে কিছু এলাকা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বাণিজ্যিক ফটোগ্রাফির জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হবে।
- কোনো কঠোর পোশাক কোড নেই, তবে আরামদায়ক এবং বিনয়ী পোশাক পরিধান করার পরামর্শ থাকবে।
- প্ল্যাটো প্রতিবন্ধী দর্শকদের জন্য কিছু সুবিধা প্রদান করে, তবে পুরো এলাকা সম্পূর্ণরূপে অ্যাক্সেসযোগ্য নাও হতে পারে কারণ এটি একটি ঐতিহাসিক সেট।
ফেসবুক: GoArif