নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে (Kathmandu) অপরিচিত বন্ধুর সাথে অসাধারণ ভ্রমণ বা পাগলাটে ভ্রমণ নিয়ে আজকের রোমাঞ্চকর ভ্রমণ কাহিনী। কাঠমান্ডু ভ্রমণের এই ভ্রমণ কাহিনী ভ্রমণ হিপ্পি থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।
তো চলুন, কাঠমান্ডুতে অপরিচিত বন্ধুর সাথে অসাধারণ ভ্রমণ শুরু করা যাক… লুম্বিনীর বাসস্ট্যান্ডের পাশে এক প্লেট বিশেষ ভেল খেতে খেতে সরিষার তেলের ঝাঁজালো স্বাদে একটু বিরক্ত লাগছিল। একইসঙ্গে, নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম লোক গিজগিজে একটা বাসে চেপে কাঠমান্ডুর দিকে যাত্রার জন্য। আর মনের কোণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম যেন পাশের সিটে কোনো নারী যাত্রী বসে। এতে অন্তত নির্ভার ঘুমানো যাবে। যদিও নেপাল Solo Traveling বা সলো নারীদের ভ্রমণের জন্য বেশ নিরাপদ, সেটা যেকোনো দেশ থেকেই হোক আর যেকোনো পোশাকেই।
“গার্ল সিট গার্ল সিট ঠিক আছে ম্যাডাম?” এক কর্মী তার ভাঙা ইংরেজিতে এমনটাই জানাল। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি নিজ উদ্যোগেই এটা করলেন, আমাদের জিজ্ঞেস না করেই! (ঈশ্বর কি সত্যিই আমাদের শোনেন? হাহাহা)
“হাই… আমি জুলি।” নিজেকে পরিচিত করাল সে। আলাপচারিতা খুব বেশি আনুষ্ঠানিক না হয়েই জমে উঠল। তার দুই মাসের নেপালে একক ভ্রমণের গল্প শুনতে শুনতে আমিও শেয়ার করলাম আমার ভারতে একা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে? এক রকমের পাগলাটে মনোভাব আর ভ্রমণের প্রতি ভালোবাসা আমাদের বন্ধুত্বে নতুন মাত্রা যোগ করল। মাঝে মাঝে ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু বাস থামছিল প্রায় প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর। এর মাঝেই আমাদের ভালো-মন্দ নানা ভ্রমণ কাহিনি নিয়ে আলাপচারিতা চলতে থাকল। কখন যে রাতের ঘন কালো আকাশ ধূসর হয়ে গেল, টেরই পাইনি।
আরও: ঘাটশিলার ফুলডুংরি পাহাড় ভ্রমণ
সকালে নতুন পরিকল্পনা
সকালে বিদায় জানানোর বদলে ঠিক হলো, আমরা একসাথে কাঠমান্ডু ঘুরব। জুলি বলল, সেও আমার সাথে যোগ দেবে। হোস্টেলে পৌঁছানোর পর দেখি, সে আগেই হোস্টেল বুক করেছে। আমি তখন খরচ কমানোর মুডে, তাই শুধু সেখানে ফ্রেশ হয়ে গোসল করে নিলাম। এরপর আমরা দু’জনে মিলে ব্রাউনি আর গাঢ় নেপালি কফিতে চমুক দিলাম।
পাসপোর্ট ছাড়া বাইক ভাড়া নেয়া এক রকম ঝক্কির কাজ। সস্তায় বাইক খোঁজার উদ্দেশ্যে থামেলের রঙিন বাজারে ঘুরে বেড়ালাম। এই বাজারে ছোট ছোট ঘরে নারীরা গরম জিলাপি ভাজছেন, আর অন্যরা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। এই পরিবেশে এক অন্যরকম উষ্ণতা পাওয়া যায়।
পশুপতিনাথ মন্দির
অবশেষে আমরা আমাদের স্কুটারে চেপে রওনা দিলাম পশুপতিনাথ মন্দিরের দিকে, ভিড় হওয়ার আগেই। মন্দিরের বাইরের দিক থেকে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি। তবে একবার ভেতরে প্রবেশ করতেই যেন মনে হল কোনো দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সেটে চলে এলাম। পুরনো রুপালি কাঠামোর ওপর সূক্ষ্ম কারুকাজ, বিশালাকার প্রহরী মূর্তি আর বড়সড় যজ্ঞকুণ্ড এক দেবীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
মন্দিরের মূল শিবলিঙ্গ চারমুখী এবং এটি চারটি দরজা দিয়ে ভক্তদের আশীর্বাদ প্রদান করে। মন্দির চত্বরে আরও অনেক ছোট ছোট মন্দির রয়েছে। বাগমতি নদী ধীর গতিতে বয়ে চলেছে, যেখানে ভক্তদের পূজার ফুল এবং অন্যান্য উপাচার ভেসে যাচ্ছে। নদীর পাড়ে সন্ন্যাসীরা বসে আছেন, যজ্ঞের ধোঁয়া আকাশে মিশে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করছে।
আরও: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি লেঙ্গুরা
পাতন স্কোয়ার
এরপর আমরা পৌঁছালাম পাতন স্কোয়ারে। নেপালের সাংস্কৃতিক রাজধানী পাতন হলো শিল্পপ্রেমীদের জন্য এক অসাধারণ জায়গা। কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ, ধাতব শিল্প আর চিত্রকলার প্রতি যদি আপনার আগ্রহ থাকে, তবে এখানে আসা অবশ্যই উচিত।
কাঠমান্ডু দরবার স্কোয়ারে ঢুকে মনে হলো যেন ইতিহাস আর বর্তমান এক জায়গায় মিশে গেছে। কাঠের নেপালি স্থাপত্য, পুরনো রাজপ্রাসাদ, কুমারী মহল, আর স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের সরব উপস্থিতি স্কোয়ারটিকে এক আলাদা প্রাণ দিয়েছে।
জীবন্ত দেবী কুমারীর দর্শন
কুমারী মহলের বারান্দা থেকে জীবন্ত দেবীর এক ঝলক পেতে হাজারো মানুষ অপেক্ষা করছিল। সেদিনের দেবী ছিল মাত্র ৪ বছরের এক ছোট্ট মেয়ে। তার সাজগোজ, তার নিষ্পাপ চাহনি দেখে দর্শনার্থীদের মুগ্ধতা লুকানো দায়। কিন্তু সেই সাথে মনে হলো, শৈশবের যে সরল আনন্দ থেকে সে বঞ্চিত, সেটা তাকে কি কখনো পীড়া দেয়?
আমরা তাকিয়ে দেখছিলাম, দেবী দর্শন শেষে তাকে আবার ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। কুমারী মহল তখন দর্শনার্থীশূন্য হয়ে গেল। দরবার স্কোয়ারের প্রবেশ টিকিট না নিয়ে আমরা ঢুকে পড়েছিলাম। পরে এক গার্ড আমাদের জিজ্ঞেস করল, আর আমরা কৌশলে তাকে এড়িয়ে গেলাম। এরপর স্কোয়ারের আরও কিছু ছবি তুলে আমরা হাসতে হাসতে সেই স্থান ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
দিনশেষে স্থানীয় দোকানে দইপুরি আর চাট খেয়ে বিদায় নিলাম। জুলি বলল, পরের বার আমি যেন প্যারিসে তার বাড়িতে যাই। একক ভ্রমণ আপনাকে অপরিচিতদের উপর আস্থা রাখতে শেখায়। আর কখনো কখনো, আপনাকে এমন বন্ধুত্ব উপহার দেয় যা আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকে। আপনার একক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কী? কমেন্টে শেয়ার করুন!
ইউটিউব: GoArif
