মহেঞ্জোদাড়ো (Mohenjo-Daro), প্রায় ৫০০০ বছর আগে পাকিস্তানের সিন্ধু নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল এক অসাধারণ শহর। যেখানে ছিল সুপরিকল্পিত রাস্তাঘাট, আধুনিক নিকাশি ব্যবস্থা, বহুতল ভবন আর স্নানাগার। মিশর আর মেসোপটেমিয়ার সমসাময়িক এই সভ্যতা ছিল তার সময়ের সবচেয়ে উন্নত। আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে মাটির নিচে হাজার হাজার বছর ধরে লুকিয়ে থাকার পর আবিষ্কৃত হয়েছে এই শহর।
পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় অবস্থিত মহেঞ্জোদাড়ো ইতিহাসপ্রেমী আর প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে এক স্বপ্নের জায়গা। সিন্ধি ভাষায় “মোহেঞ্জোদাড়ো” শব্দের অর্থ “মৃতদের ঢিবি”। ১৯৮০ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দিয়েছে। এই প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ আজও বলে দেয় সিন্ধু সভ্যতার মানুষ কতটা উন্নত ছিল।
আরও: পাকিস্তানের সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান
ইতিহাস ও আবিষ্কার
সিন্ধু সভ্যতা
মোহেঞ্জোদাড়ো ছিল সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতার (Indus Valley Civilization) প্রধান শহরগুলোর একটি। এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ থেকে ১৩০০ অব্দের মধ্যে। তবে মহেঞ্জোদাড়োর স্বর্ণযুগ ছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দ পর্যন্ত। এটি ছিল পরিপক্ব হরপ্পা যুগ (Mature Harappan period)।
সিন্ধু সভ্যতা বিস্তৃত ছিল প্রায় ১০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে। বর্তমান পাকিস্তান, উত্তর-পশ্চিম ভারত, পূর্ব আফগানিস্তান পর্যন্ত। এই সভ্যতার প্রধান শহর ছিল হরপ্পা (পাঞ্জাবে), মোহেঞ্জোদাড়ো (সিন্ধুতে), লোথাল, কালিবাঙ্গান, ধোলাভীরা আর রাখিগড়ি।
মোহেঞ্জোদাড়ো শহরের আকার ছিল প্রায় ৫ কিলোমিটার পরিধি। শহরটি সিন্ধু নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ছিল। জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩৫,০০০ থেকে ৫০,০০০। সেই সময়ের হিসেবে এটি ছিল একটি বিশাল মহানগর। পৃথিবীর প্রথম দিকের পরিকল্পিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আবিষ্কারের গল্প
১৯১১ সালে প্রথম এই স্থানে প্রাচীন ইট-পাথরের চিহ্ন আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকরা বুঝতে পারেননি এর গুরুত্ব। মনে করেছিলেন হয়তো বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। ১৯২২ সালে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস ব্যানার্জি এখানে খনন শুরু করেন। তিনি একটি বৌদ্ধ স্তূপ খুঁজছিলেন। কিন্তু খুঁজে পেলেন তার চেয়েও প্রাচীন এক সভ্যতা।
১৯২৪ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জন মার্শাল আনুষ্ঠানিকভাবে মোহেঞ্জোদাড়ো আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। ১৯৩০-এর দশকে মার্শাল, ডি.কে. দীক্ষিত আর আর্নেস্ট ম্যাকের নেতৃত্বে ব্যাপক খনন কাজ হয়। ১৯৪৫ সালে মর্টিমার হুইলার আর আহমদ ড্যানি আরও খনন করেন। সর্বশেষ বড় খনন হয় ১৯৬৪-৬৫ সালে জর্জ ডেলসের নেতৃত্বে।
১৯৬৫ সালের পর আর কোনো খনন করা হয়নি। কারণ আবহাওয়ার প্রভাবে উন্মুক্ত স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। এরপর শুধু সংরক্ষণ কাজ, সার্ভে আর জরুরি খনন করা হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে জার্মান আর ইতালীয় দল কম ক্ষতিকর পদ্ধতিতে স্থাপত্য জরিপ আর গবেষণা করেন। ২০১৫ সালে পাকিস্তানের ন্যাশনাল ফান্ড কোর ড্রিলিং করে দেখেন যে মাটির নিচে আরও অনেক কিছু লুকিয়ে আছে।
রহস্যময় সমাপ্তি
মোহেঞ্জোদাড়ো কেন পরিত্যক্ত হয়েছিল তা নিয়ে আজও রহস্য। খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ অব্দের দিকে শহরটি পরিত্যক্ত হয়। পুরো সিন্ধু সভ্যতাই খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ অব্দের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কিছু গবেষক মনে করেন জলবায়ু পরিবর্তন আর খরার কারণে মানুষ চলে গেছে। সিন্ধু নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে জলসংকট দেখা দিয়েছিল। অন্যরা মনে করেন বন্যা বা ভূমিকম্পের কারণে শহর ধ্বংস হয়েছে। কেউ কেউ বলেন বাইরের আক্রমণকারীরা শহর দখল করেছিল। তবে সঠিক কারণ আজও অজানা।
যা জানা গেছে তা হলো শহরটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়েছে। কোনো আকস্মিক ধ্বংস হয়নি। মানুষ নিজেদের মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেছে। শহরটি মাটির নিচে চাপা পড়ে হাজার হাজার বছর লুকিয়ে ছিল। এই কারণেই এত ভালোভাবে সংরক্ষিত আছে।
আরও: স্কার্দু
প্রধান দর্শনীয় স্থান সমূহ
সিটাডেল বা উপরের শহর
সিটাডেল হচ্ছে মহেঞ্জোদাড়োর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে পাঁচটি প্রধান স্থাপনা আছে যা দেখতে হবে।
বৌদ্ধ স্তূপ: সিটাডেলের সবচেয়ে উপরে একটি বৌদ্ধ স্তূপ। এটি মোহেঞ্জোদাড়ো শহরের অনেক পরে (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়-পঞ্চম শতকে) নির্মিত। স্তূপটি মূল শহরের ধ্বংসাবশেষের উপর তৈরি। এই স্তূপ দেখেই প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রথম এখানে খনন শুরু করেছিলেন। স্তূপ থেকে পুরো শহরের অসাধারণ ভিউ দেখা যায়।
মহান স্নানাগার: ইতিমধ্যে বলা হয়েছে। এটি মিস করার নয়। পুকুরের চারপাশে হাঁটুন, কলোনেডগুলো দেখুন। কল্পনা করুন ৫০০০ বছর আগে মানুষ এখানে স্নান করছে।
গ্রানারি: বিশাল শস্যাগার। নিচের বায়ুচলাচল ব্যবস্থা দেখুন। কত উন্নত প্রযুক্তি ছিল তাদের।
অ্যাসেম্বলি হল: সভাকক্ষের ধ্বংসাবশেষ। কল্পনা করুন এখানে বসে শাসকরা রাষ্ট্র চালানোর সিদ্ধান্ত নিতেন।
প্রিস্ট-কিং মূর্তি পাওয়ার স্থান: সিটাডেলে এমন একটি স্থান আছে যেখানে বিখ্যাত “প্রিস্ট-কিং” মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল। মূর্তিটি এখন পাকিস্তান জাতীয় জাদুঘরে। তবে স্থানটি দেখা যায়।
নিচের শহর বা আবাসিক এলাকা
নিচের শহরে ঘুরে ঘুরে দেখুন কীভাবে মানুষ বাস করত।
আবাসিক বাড়িঘর: সারি সারি বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। কিছু বাড়িতে ঢুকে দেখতে পারবেন রুমের বিন্যাস। কোথায় রান্নাঘর ছিল, কোথায় শোবার ঘর। দেয়ালগুলো অবাক করার মতো ভালো অবস্থায় আছে।
রাস্তাঘাট: গ্রিড প্যাটার্নের রাস্তায় হাঁটুন। দেখুন কত সুপরিকল্পিত। প্রতিটি কোণ সমকোণ। আধুনিক শহরের মতোই।
ড্রেনেজ সিস্টেম: রাস্তার পাশে ড্রেনগুলো দেখুন। কিছু জায়গায় ঢাকনা এখনও আছে। ম্যানহোল দেখা যায়। কত উন্নত ছিল তাদের স্যানিটেশন।
কারখানা এলাকা: রঞ্জকদের কর্মশালা, পুঁতির কারখানা দেখুন। কীভাবে তারা কাজ করত, কল্পনা করুন।
কূপ: শহরে প্রায় ৭০০টি কূপ ছিল। অনেকগুলো এখনও দেখা যায়। গভীর কূপ, পোড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি।
মোহেঞ্জোদাড়ো জাদুঘর
সাইটের ঠিক পাশেই মোহেঞ্জোদাড়ো জাদুঘর। এখানে খনন থেকে পাওয়া হাজার হাজার জিনিস প্রদর্শিত। মাটির পাত্র, খেলনা, অলংকার, সীলমোহর, মূর্তি, অস্ত্র, সরঞ্জাম। “প্রিস্ট-কিং” মূর্তির প্রতিলিপি এখানে আছে। “ডান্সিং গার্ল” মূর্তির ছবিও দেখতে পারবেন (আসল মূর্তি দিল্লিতে)।
জাদুঘরে খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা দেওয়া আছে সিন্ধু সভ্যতার জীবনযাত্রা সম্পর্কে। তারা কী খেত, কী পরত, কীভাবে ব্যবসা করত, কীসে বিশ্বাস করত। ডায়োরামা দিয়ে দেখানো হয়েছে তখনকার দৃশ্য। খুবই তথ্যবহুল।
জাদুঘরে প্রায় ১-১.৫ ঘণ্টা সময় দিন। সব কিছু ভালো করে দেখুন। এরপর সাইট ঘুরতে গেলে বুঝতে সুবিধা হবে।
সিন্ধু লিপি
মোহেঞ্জোদাড়োতে হাজার হাজার সীলমোহর পাওয়া গেছে। সেগুলোতে খোদাই করা আছে রহস্যময় সিন্ধু লিপি। ৪০০-৬০০টি ভিন্ন চিহ্ন বা প্রতীক। আজও কেউ এই লিপি পড়তে পারেনি। বিশ্বের সেরা ভাষাবিদরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখনও সফল হননি।
সীলমোহরগুলোতে সাধারণত পশুর ছবি থাকে। এক শিং বিশিষ্ট ষাঁড় সবচেয়ে বেশি। হাতি, গন্ডার, বাঘ, মহিষও আছে। কিছু সীলে দেবতার মতো মূর্তি দেখা যায়। যোগাসনে বসা এক মূর্তি আছে যাকে “প্রোটো-শিব” বলা হয়।
সীলমোহর সম্ভবত ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহৃত হতো। পণ্যের প্যাকেটে সীল মেরে মালিকানা প্রমাণ করা হতো। কিংবা পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহার হতো। সীলগুলো দেখলে বোঝা যায় তাদের শিল্পকলা কত উন্নত ছিল। ছোট্ট জায়গায় এত সূক্ষ্ম কাজ।
বিখ্যাত শিল্পকর্ম
মোহেঞ্জোদাড়ো থেকে পাওয়া দুটি মূর্তি বিশ্ববিখ্যাত।
প্রিস্ট-কিং (পুরোহিত রাজা): চুনাপাথরের তৈরি একটি ছোট মূর্তি। মাত্র ১৭.৫ সেন্টিমিটার উঁচু। একজন দাড়িওয়ালা মানুষের আবক্ষ মূর্তি। কপালে ফিতা বাঁধা, বাম কাঁধে ত্রিফলি নকশা করা চাদর। চোখ দুটো সরু, মুখভাব গম্ভীর। দেখে মনে হয় কোনো রাজা বা পুরোহিত। ১৯২৭ সালে জন মার্শাল এটি খুঁজে পান। এখন পাকিস্তান জাতীয় জাদুঘরে কারাচিতে আছে।
ডান্সিং গার্ল (নৃত্যরত বালিকা): ব্রোঞ্জের তৈরি ছোট্ট একটি মূর্তি। মাত্র ১০.৫ সেন্টিমিটার। নগ্ন এক তরুণী, হাতে অনেক চুড়ি, এক হাত কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ভঙ্গিমা অত্যন্ত আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী। এত ছোট মূর্তিতে এত জীবন্ত ভাব। ১৯২৬ সালে পাওয়া। এখন ভারতের জাতীয় জাদুঘরে নয়াদিল্লিতে সংরক্ষিত।
এই দুটি মূর্তি প্রমাণ করে সিন্ধু সভ্যতার মানুষ কত দক্ষ শিল্পী ছিল। ধাতু ও পাথরের কাজে তাদের দক্ষতা অসাধারণ।
আরও: ফেয়ারি মিডোজ
কখন যাবেন
মোহেঞ্জোদাড়ো যাওয়ার সেরা সময় হচ্ছে শীতকাল। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত।
শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি): এই সময় আবহাওয়া সবচেয়ে ভালো। দিনের তাপমাত্রা ২০-২৭°সে। রাতে ১০-১৫°সে। আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য আদর্শ। আকাশ পরিষ্কার থাকে, ফটোগ্রাফিও ভালো হয়। এই সময় পর্যটক বেশি থাকে।
বসন্ত (মার্চ-এপ্রিল): মোটামুটি ভালো সময়। তাপমাত্রা ২৫-৩৫°সে। এপ্রিলের শেষে গরম বাড়তে শুরু করে। পর্যটক কম থাকে, শান্তিতে ঘোরা যায়।
গ্রীষ্মকাল (মে-সেপ্টেম্বর): একদম এড়িয়ে চলুন। তাপমাত্রা ৪০-৫০°সে পর্যন্ত উঠে যায়। প্রচণ্ড গরম, প্রায় অসহ্য। রোদ এত তীব্র যে বাইরে বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব না। এই সময় খুবই কম পর্যটক আসে। অনেক হোটেল বন্ধ থাকে।
বর্ষাকাল (জুলাই-সেপ্টেম্বর): মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। তবে খুব বেশি না। তবুও গরম থাকে। এই সময়ও এড়িয়ে যাওয়া ভালো।
সেরা মাস: ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি।
কীভাবে যাবেন
বিমানে
মহেঞ্জোদাড়োর নিজস্ব একটি ছোট বিমানবন্দর আছে। তবে এটি খুব ছোট, বড় বিমান ল্যান্ড করতে পারে না। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ) কারাচি থেকে মোহেঞ্জোদাড়ো সরাসরি ফ্লাইট চালায়। সপ্তাহে ৩ দিন, ছোট প্রপেলার বিমান ATR 42 ব্যবহার করা হয়। ফ্লাইটে সময় লাগে মাত্র ১ ঘণ্টা। এক দিকের টিকিট খরচ প্রায় ৬,০০০ পাকিস্তানি রুপি (প্রায় ২০ ডলার)।
তবে ফ্লাইট নিয়মিত নয়। মাঝে মাঝে বাতিল হয়। আগে থেকে বুকিং নিশ্চিত করে নিতে হবে। বিমানবন্দর থেকে সাইট মাত্র ৫ কিলোমিটার। ট্যাক্সিতে ১৫ মিনিট।
সড়কপথে
বেশিরভাগ মানুষ সড়কপথে আসেন। কয়েকটি রুট আছে।
কারাচি থেকে: কারাচি থেকে মোহেঞ্জোদাড়ো প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার দূরে। ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে যেতে হয়। সময় লাগে ৬-৭ ঘণ্টা। রাস্তা মোটামুটি ভালো।
প্রাইভেট গাড়ি/ট্যাক্সি: কারাচি থেকে প্রাইভেট ট্যাক্সি ভাড়া ১৫,০০০-২৫,০০০ রুপি। গাইড সহ ট্যুর প্যাকেজ ২৫,০০০-৫০,০০০ রুপি। অনেক ট্যুর অপারেটর ডে ট্রিপ অফার করে।
বাস: NATCO বা দেওয়ানো বাস সার্ভিস আছে কারাচি থেকে। সুক্কুর বা লারকানা পর্যন্ত বাস যায়। সেখান থেকে স্থানীয় ট্রান্সপোর্ট। বাস ভাড়া ১,০০০-১,৫০০ রুপি। তবে যাত্রা অনেক ক্লান্তিকর।
সুক্কুর/লারকানা থেকে: মহেঞ্জোদাড়োর সবচেয়ে কাছের বড় শহর সুক্কুর (প্রায় ৫০ কিলোমিটার) আর লারকানা (৩০ কিলোমিটার)। এই শহরে ট্রেন স্টেশন আছে। এখান থেকে ট্যাক্সি বা বাস ভাড়া করে মোহেঞ্জোদাড়ো যেতে পারবেন। ট্যাক্সি ভাড়া ২,০০০-৩,০০০ রুপি।
কোথায় থাকবেন
মোহেঞ্জোদাড়োতে থাকার অপশন সীমিত। কয়েকটা বিকল্প আছে।
মোহেঞ্জোদাড়োতে থাকা:
- আর্কিওলজিক্যাল গেস্ট হাউস: সাইটের পাশেই সরকারি গেস্ট হাউস। বেসিক সুবিধা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। রাতে থাকলে ভোরে সাইট ঘুরতে পারবেন, যখন পর্যটক কম থাকে। রুম ভাড়া ২,০০০-৩,৫০০ রুপি। আগে থেকে বুক করা ভালো।
- মোয়েনজো ডারো মিউজিয়াম রেস্ট হাউস: জাদুঘরের কাছে ছোট্ট রেস্ট হাউস। খুবই বেসিক। দাম ১,৫০০-২,৫০০ রুপি।
লারকানায় থাকা:
লারকানায় বেশ কিছু হোটেল আছে। এখান থেকে রোজ মোহেঞ্জোদাড়ো আসা-যাওয়া করা যায়।
- হোটেল সিন্ধু: মোটামুটি মানের। রুম ভাড়া ৩,০০০-৫,০০০ রুপি।
- হোটেল মেহরান: বাজেট হোটেল। দাম ১,৫০০-২,৫০০ রুপি।
- হোটেল ডায়মন্ড: ভালো সুবিধা। দাম ৪,০০০-৭,০০০ রুপি।
সুক্কুরে থাকা:
সুক্কুরে আরও ভালো হোটেল আছে। তবে মোহেঞ্জোদাড়ো একটু দূর (৫০ কিলোমিটার)।
- মিনহাজ হোটেল: ভালো মানের। রুম ভাড়া ৫,০০০-৮,০০০ রুপি।
- হোটেল ওয়ান: আধুনিক সুবিধা। দাম ৬,০০০-১০,০০০ রুপি।
বেশিরভাগ হোটেলে এসি, ওয়াই-ফাই, রেস্তোরাঁ থাকে। তবে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল এ অঞ্চলে নেই।
কোথায় খাবেন
মোহেঞ্জোদাড়োতে খাবারের অপশন খুবই কম। সাইটের কাছে ছোট্ট কিছু ধাবা বা চায়ের দোকান আছে। সাধারণ পাকিস্তানি খাবার – বিরিয়ানি, কারি, রুটি, চা।
মোহেঞ্জোদাড়ো সাইটে: কোনো রেস্তোরাঁ নেই। একটি ছোট স্ট্যান্ড আছে যেখানে চা, বিস্কুট, চিপস পাওয়া যায়। নিজের খাবার পানি সাথে নিয়ে যাওয়া ভালো।
লারকানায়: কয়েকটা মোটামুটি রেস্তোরাঁ আছে। স্থানীয় সিন্ধি খাবার, পাকিস্তানি খাবার। সিন্ধি বিরিয়ানি চেষ্টা করুন, একটু মসলাদার কিন্তু সুস্বাদু। সাজি বা নিহারি (মাংসের ঝোল) সকালের নাশতায় জনপ্রিয়। দাম খুবই কম, একবেলা খাওয়া ২০০-৫০০ রুপি।
সুক্কুরে: আরও ভালো রেস্তোরাঁ পাওয়া যায়। চাইনিজ, ফাস্ট ফুডও আছে।
নিরাপদ থাকতে বোতলের পানি পান করুন। রাস্তার খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন। হোটেল বা নামকরা রেস্তোরাঁয় খাওয়া ভালো।
টিপস ও সতর্কতা
- মহেঞ্জোদাড়োর ইতিহাস জানতে গাইড নেওয়া ভালো। সাইটে লাইসেন্সপ্রাপ্ত গাইড পাওয়া যায়। ভাড়া ১,০০০-২,০০০ রুপি। ইংরেজি বা উর্দুতে ব্যাখ্যা দেন। গাইড ছাড়া অনেক কিছু বুঝতে পারবেন না।
- পুরো সাইট ভালোভাবে দেখতে ৩-৪ ঘণ্টা লাগে। জাদুঘর ১-১.৫ ঘণ্টা। মোট ৫-৬ ঘণ্টা হাতে রাখুন। ভোরে বা বিকেলে যান, তখন রোদ কম থাকে।
- আরামদায়ক জুতা পরুন। অনেক হাঁটতে হবে। হাল্কা, ঢিলেঢালা কাপড়। টুপি, সানগ্লাস অবশ্যই। সানস্ক্রিন লাগান। পাকিস্তান একটি মুসলিম দেশ, তাই শালীন পোশাক পরুন।
- প্রচুর পানি সাথে নিন। গরম অনেক, ডিহাইড্রেশন হতে পারে। বোতলজাত পানি কিনুন।
- ফটোগ্রাফির জন্য অনুমতি লাগে না। তবে ট্রাইপড ব্যবহারের জন্য আলাদা ফি দিতে হতে পারে। জাদুঘরে ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ হতে পারে, জেনে নিন।
- কিছু স্পর্শ করবেন না। প্রাচীন স্থাপনায় উঠবেন না। ময়লা ফেলবেন না। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ আমাদের দায়িত্ব।
- এখানে এটিএম নেই। পর্যাপ্ত নগদ টাকা সাথে নিন। কার্ড গৃহীত হয় না।
- মোবাইল নেটওয়ার্ক আছে তবে মাঝে মাঝে সিগন্যাল দুর্বল। ওয়াই-ফাই শুধু বড় হোটেলে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগেই ডাউনলোড করে রাখুন।
- স্থানীয় ভাষা সিন্ধি আর উর্দু। ইংরেজি খুব কম মানুষ জানে। কিছু বেসিক উর্দু শব্দ শিখে নিলে কাজে লাগবে।
- স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রতি সম্মান দেখান। মসজিদে ঢুকলে জুতা খুলে, মাথা ঢেকে ঢুকুন। ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
আরও: দীর্ঘ যাত্রায় কেন নেক পিলো ব্যবহার করবেন
এন্ট্রি ফি ও খোলার সময়
এন্ট্রি ফি:
- পাকিস্তানি নাগরিক: ৫০ রুপি
- বিদেশি: ৩,০০০ রুপি (প্রায় ১০ ডলার)
- জাদুঘর: এন্ট্রি ফিতে অন্তর্ভুক্ত
খোলার সময়:
- সাধারণত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত
- শীতকাল: সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা
- গ্রীষ্মকাল: সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা (গরমের কারণে)
- শুক্রবার: দুপুর ১২:৩০ থেকে ২:৩০ বন্ধ (নামাজের জন্য)
যাওয়ার আগে সময় নিশ্চিত করে নিন, কারণ পরিবর্তন হতে পারে।
কাছাকাছি দর্শনীয় স্থান
মোহেঞ্জোদাড়ো ছাড়াও সিন্ধু অঞ্চলে আরও কয়েকটি দর্শনীয় স্থান আছে। সেহওয়ান শরিফে (প্রায় ১২০ কিলোমিটার) সুফি সাধক লাল শাহবাজ কালান্দারের মাজার, যেখানে বছরব্যাপী ভক্তদের সমাগম হয়। সুক্কুরে ল্যান্সডাউন ব্রিজ, একটি ঐতিহাসিক ব্রিটিশ আমলের সেতু এবং সিন্ধু নদীতে ডলফিন দেখার সুযোগ।
রানিকোট ফোর্ট (বিশ্বের বৃহত্তম দুর্গ, গ্রেট ওয়াল অফ সিন্ধু নামে পরিচিত) মোহেঞ্জোদাড়ো থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে। থাট্টায় শাহজাহান মসজিদ ও মাকলি নেক্রোপলিস (বিশ্বের বৃহত্তম কবরস্থান) দেখার মতো। আমরি সাইট, আরেকটি সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। যদি ৩-৪ দিন সময় থাকে, তাহলে এই স্থানগুলো একসাথে ঘুরে আসতে পারেন। অনেক ট্যুর অপারেটর কম্বো প্যাকেজ অফার করে।
মোহেঞ্জোদাড়ো নিয়ে সচরাচর জিজ্ঞাসা
মোহেঞ্জোদাড়ো কোথায় অবস্থিত?
মোহেঞ্জোদাড়ো পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় অবস্থিত, সিন্ধু নদীর তীরে। এটি কারাচি থেকে প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার উত্তরে এবং ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৭৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে।
পরিবার নিয়ে যাওয়ার জন্য কি উপযুক্ত এবং নিরাপদ?
হ্যাঁ, মোহেঞ্জোদাড়ো পরিবার নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত এবং নিরাপদ। এটি একটি শিক্ষামূলক স্থান যেখানে শিশুরা প্রাচীন সভ্যতা সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতে পারবে।
ফেসবুক: GoArif
